নতুন বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলো ঝুঁকছে চীনের দিকে

উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক যুদ্ধ নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা দেশগুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছে—নিরাপত্তার জন্য একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা আর যথেষ্ট নয়। ফলে, বিকল্প শক্তি হিসেবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার দিকে ঝুঁকছে তারা।

Apr 20, 2026 - 20:59
নতুন বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলো ঝুঁকছে চীনের দিকে
চীনা নেতা শি জিনপিং ও সৌদি আরবের মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: সংগৃহীত

উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক যুদ্ধ নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ড্রোন হামলার মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা দেশগুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছেনিরাপত্তার জন্য একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা আর যথেষ্ট নয়। ফলে, বিকল্প শক্তি হিসেবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার দিকে ঝুঁকছে তারা।

দুই মাসের সংঘাতে অঞ্চলের দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার ধারণা নড়ে গেছে। এতদিন করমুক্ত সুবিধা, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা আধুনিক স্টার্টআপ সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে অর্থনীতি এগোলেও নিরাপত্তা ছিল মূলততেলের বিনিময়ে নিরাপত্তাকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি প্রতিরক্ষা ছাতাই ছিল সেই ব্যবস্থার ভিত্তি।

কিন্তু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এই নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। ফলে নতুন বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলো পূর্বের দিকে, বিশেষ করে চীনের দিকে নজর দিচ্ছেযেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ইতোমধ্যেই শক্ত ভিত্তি পেয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ অবকাঠামো খাতে চীনের উপস্থিতি দ্রুত বেড়েছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ইতোমধ্যেই প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা এই অঞ্চলে বেইজিংকে প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শি জিনপিংয়ের ২০২৩ সালের জিসিসি সফরের পর এই সম্পর্ক নতুন গতি পায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক তিনটি খাতকে ঘিরেই এগিয়ে যাবে। প্রথমত, সবুজ জ্বালানি। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে চীনের বৈশ্বিক আধিপত্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেলনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যকে সহায়তা করছে। বিওয়াইডি বা গিলির মতো কোম্পানির মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন খাতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ‘ব্রিকস প্লাসকাঠামো। এটি ভবিষ্যতে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। ডলারের বাইরে বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থার পরীক্ষাও শুরু হয়েছে। চীন সংযুক্ত আরব আমিরাতেরএমব্রিজপ্রকল্প তারই একটি উদাহরণ, যেখানে ডিজিটাল মুদ্রায় আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের চেষ্টা চলছে।

তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সংযোগ। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিসিই) এবং গোয়াদার বন্দরের মতো প্রকল্পে যুক্ত হয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের বাণিজ্যপথকে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করতে চায়। এতে তারা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই ঘনিষ্ঠতারও সীমা রয়েছে। সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বড় ব্যবধান এখনো স্পষ্ট। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যার বড় অংশ অবস্থান করছে কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিতে। বিপরীতে, চীনের সামরিক উপস্থিতি সীমিত।

অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো শীর্ষে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের মোট অস্ত্র আমদানির বড় অংশই এসেছে ওয়াশিংটন থেকে। যদিও চীনা ড্রোন তুলনামূলকভাবে সহজ শর্তে পাওয়া যায়, তবুও সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তারা এখনো পিছিয়ে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো চীনকে নতুন যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে দেখছে না। বরং এটি একটিব্যাকআপবা বিকল্প শক্তিযার মাধ্যমে তারা কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াতে চায়।

পুরনোতেলের বিনিময়ে নিরাপত্তাধারণা দুর্বল হয়ে পড়ায় নতুন বাস্তবতায় বহুমুখী অংশীদারিত্বই এখন তাদের লক্ষ্য। এই পরিবর্তন মূলত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকার এক বাস্তববাদী কৌশল।

তথ্যসূত্র: এশিয়া টাইমস