জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করতে ১৮৮৪ সালের রায় ট্রাম্প প্রশাসনের হাতিয়ার
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া সীমিত করার পরিকল্পনায় এবার ১৮৮৪ সালের একটি সুপ্রিম কোর্টের রায়কে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই রায়ের সঙ্গে বর্তমান অভিবাসন ইস্যুর সরাসরি সম্পর্ক নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া সীমিত করার পরিকল্পনায় এবার ১৮৮৪ সালের একটি সুপ্রিম কোর্টের রায়কে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই রায়ের সঙ্গে বর্তমান অভিবাসন ইস্যুর সরাসরি সম্পর্ক নেই।
ট্রাম্প প্রশাসন যে মামলার কথা উল্লেখ করছে তা হলো ‘এল্ক বনাম উইলকিন্স’। এতে আদালত রায় দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নেটিভ আমেরিকানদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিক হিসেবে গণ্য করা যাবে না—কারণ তারা তখন উপজাতীয় সার্বভৌম ব্যবস্থার অধীনে ছিল।
‘এল্ক বনাম উইলকিন্স’ সম্পর্কে জানতে পেছনে ফিরে যেতে হয়। ১৮৮০ সালের ৫ এপ্রিল, ওমাহা নির্বাচনের কর্মকর্তা চার্লস উইলকিন্স জন এল্ক নামক এক ব্যক্তিকে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করতে অস্বীকার করেছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছিলেন, এল্ক একজন নেটিভ আমেরিকান (আদিবাসী), তাই তিনি আমেরিকার নাগরিক নন।
এল্ক, যিনি নেব্রাস্কার উইনেবাগো উপজাতির সদস্য ছিলেন বলে ধারণা করা হয়, চার্লস উইলকিন্সের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন। জানান, তিনি তার উপজাতির সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন এবং স্বেচ্ছায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের শাসন মেনে নিয়েছেন। তিনি আইনি লড়াই শুরু করেন এবং যুক্তি দেন যে, মার্কিন ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়ায় তিনি জন্মসূত্রেই একজন নাগরিক।
কিন্তু ১৮৮৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট 'এল্ক বনাম উইলকিন্স' মামলায় তার বিপক্ষে রায় দেয়। আদালত রায় দেন, মার্কিন ভূখণ্ডে জন্ম নিলেও আদিবাসীরা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবেন না। তাদের মর্যাদা হবে ‘কোনো বিদেশি সরকারের প্রজার সন্তানদের মতো, যারা সেই সরকারের শাসনাধীন এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছে।’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন স্বয়ংক্রিয় জন্মগত নাগরিকত্ব বাতিলের পরিকল্পনা রক্ষায় এই মামলাটিকে নজির হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যাখ্যার একটি নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বুধবার সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। তাতে বলা হয়েছে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব কেবল তারাই পাবে যাদের অন্তত একজন অভিভাবক মার্কিন নাগরিক অথবা স্থায়ী আইনি বাসিন্দা । প্রশাসনের যুক্তি, সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর ‘সাবজেক্ট টু দ্য জুরিসডিক্টশন’ অংশটি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
এই অবস্থানকে সমর্থন করতে সরকার 'এল্ক বনাম উইলকিন্স' মামলার দৃষ্টান্ত তুলে ধরছে। তবে নিম্ন আদালত ইতোমধ্যে এই আদেশ স্থগিত করেছে, এবং বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্টে শুনানির অপেক্ষায়।
নাগরিক অধিকার সংগঠন আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন বলছে, এই উদ্যোগ মূলত অভিবাসীদের সন্তানদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা। তাদের মতে, নেটিভ আমেরিকানদের আইনি অবস্থান ‘স্বতন্ত্র ও জটিল’, যা অভিবাসন আইনের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আইন বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করে বলেছেন, ওই রায়কে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা ‘ভুল ব্যাখ্যা’। কারণ এটি শুধুমাত্র উপজাতীয় শাসনব্যবস্থার বিশেষ প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য ছিল।
১৮৯৮ সালের ‘ইউনাইটেড স্টেটস বনাম ওং কিম আর্ক’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই নাগরিক—অভিভাবকের অভিবাসন অবস্থান যাই হোক না কেন (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান যুক্তি মূলত আগের ব্যর্থ আইনি ব্যাখ্যার পুনরাবৃত্তি। ফলে সুপ্রিম কোর্টে এ নিয়ে বড় ধরনের সাংবিধানিক বিতর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: এনবিসি