নাগরিকত্ব পেতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান প্রসবের সুযোগ বন্ধ হচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নবজাতকের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার প্রবণতা ঠেকাতে নতুন করে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। গর্ভবতী নারীদের ভিসা প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা চক্রগুলোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নবজাতকের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার প্রবণতা ঠেকাতে নতুন করে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। গর্ভবতী নারীদের ভিসা প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা চক্রগুলোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
রয়টার্সের পাওয়া অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সারা দেশে তদন্তকারীদের ‘বার্থ ট্যুরিজম ইনিশিয়েটিভ’-এ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর লক্ষ্য—বিদেশি নারীদের যুক্তরাষ্ট্রে এনে সন্তান জন্মদানে সহায়তা করা সংগঠিত চক্রগুলো শনাক্ত ও ভেঙে দেওয়া।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত আছে—দেশের মাটিতে জন্ম নিলেই স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই নীতিকে সীমিত করার চেষ্টা করছে, আর ‘বার্থ ট্যুরিজম’ ইস্যুকেই এর প্রধান যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, “অবাধ জন্ম পর্যটন করদাতাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করছে।” তাঁর দাবি, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই জন্মসূত্রে এমন স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্বের সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়া বেআইনি নয়। তবে ভিসা আবেদনে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা প্রতারণার মাধ্যমে এই সুযোগ নেওয়া হলে তা ফেডারেল অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) জানিয়েছে, তারা এমন চক্রের তথ্য পেয়েছে যারা জন্ম পর্যটনের জন্য বিদেশিদের সহায়তা করছে। তবে চলমান তদন্ত নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি সংস্থাটি।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই ২০২০ সালে একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছিল, যেখানে বলা হয়—শুধু সন্তানকে নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পর্যটক ভিসা ব্যবহার করা যাবে না। নতুন উদ্যোগ সেই নীতিকে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের দিকেই ইঙ্গিত করছে।
২০২৫ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অভিবাসন কমাতে আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি ক্ষমতার প্রথম দিনেই তিনি একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন, যেখানে বলা হয়—যদি বাবা-মায়ের কেউ মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা না হন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মালেও সন্তান নাগরিকত্ব পাবে না। এই পদক্ষেপ দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ব্যাখ্যার বিপরীত হওয়ায় ফেডারেল আদালতে আটকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়।
জন্ম পর্যটনের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে অভিবাসন কমানোর পক্ষে সক্রিয় সেন্টার ফর ইমিগ্রিশন স্টাডিজের মতে, ২০১৬-১৭ সালের মধ্যে এক বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার নারী এই উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বছরে প্রায় ৩৬ লাখ জন্মের মধ্যে এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। তবুও রিপাবলিকানদের একটি অংশ এই ইস্যুকে বড় করে তুলে নাগরিকত্ব নীতিতে পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে।
নতুন উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে এইচএসআই। তাদের লক্ষ্য মূলত প্রতারণা, আর্থিক অপরাধ ও অভিবাসন প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত সংগঠিত নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। এর আগে ২০১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘বার্থ হাউস’ পরিচালনার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। ওই চক্র মূলত বিদেশি—বিশেষ করে চীনা—নারীদের এই সুবিধা নিতে সহায়তা করত।
সব মিলিয়ে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রশাসন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের যুক্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে সমালোচকদের মতে—এটি শত বছরের আইনি ঐতিহ্য বদলে দেওয়ার চেষ্টা। ফলে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ ঠেকানোর উদ্যোগ এখন শুধু অভিবাসন নীতি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের মৌলিক ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স