ডিজেল সংকটে বিপাকে কৃষক, বোরো মৌসুমে উৎপাদন নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের কৃষিখাতে। বাংলাদেশ-এর বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলের সংকটে সেচ ব্যাহত হওয়ায় বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো কৃষক।

Apr 10, 2026 - 14:46
ডিজেল সংকটে বিপাকে কৃষক, বোরো মৌসুমে উৎপাদন নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে
দেশজুড়ে ডিজেলের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে সেচ। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের কৃষিখাতে। বাংলাদেশ-এর বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলের সংকটে সেচ ব্যাহত হওয়ায় বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো কৃষক।

১৭ কোটির এই দেশে চাল প্রধান খাদ্য। মার্চের শেষ দিকটি বোরো ধানের চাষাবাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু ডিজেলের ঘাটতি, সীমিত বিক্রি এবং পাম্পে দীর্ঘ লাইনের কারণে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে ধানের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া, ফলন কমে যাওয়া এবং কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।

বাংলাদেশ তার পরিশোধিত জ্বালানি চাহিদার ৮০% আমদানির ওপর নির্ভর করে, যার বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও কৃষকরা বলছেন তারা চরম সংকটে আছেন।

রাজধানী ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জে ৩৫ বছর বয়সী কৃষক মোহাম্মদ ইউসুফ তার শুকনো জমির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ধুঁকতে থাকা চারাগুলো দেখাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘যদি ধান ফলাতে না পারি, তবে আমরা কী খাব? ধানই আমাদের একমাত্র সম্বল। এটি দিয়েই আমাদের সংসার চলে। এই জ্বালানি সংকট আমাদের গভীর বিপদে ফেলেছে।

ইউসুফ দিনে ডিজেলের জন্য লাইনে দাঁড়ান এবং রাতে জমিতে কাজ করেন। অনেক পাম্পে এখন 'তেল নেই' লেখা ব্যানার ঝুলছে। ইউসুফ আরও বলেন, ‘আমরা সারা দিন পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি, তারপর অন্ধকারে মাঠে এসে সেচ, চাষ, সার দেওয়া চারা রোপণের কাজ করি। গত কয়েক সপ্তাহে দিনের বেলা কেউ কাজ করতে পারছে নাসবাই লাইনে আটকে থাকে। কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও সারা দিন অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরতে হয়।

জ্বালানি পাওয়া গেলেও তা অত্যন্ত সীমিত। ইউসুফ জানান, ‘তারা জনপ্রতি লিটারের বেশি দেয় না। আমরা দুই-তিনজন মিলে গেলে ভাগ্য ভালো হলে ১০ বা ১৫ লিটার পাই। এতে বড়জোর দুই থেকে তিন দিনের সেচ চলে।

তার চারপাশের জমি এখন ফেটে চৌচির, চারাগাছগুলো হলদে হয়ে যাচ্ছে। সেচ পাম্পগুলো ডিজেলের শেষ বিন্দু দিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে চলছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘জমির দিকে তাকিয়ে দেখুনসব শুকিয়ে যাচ্ছে। আমরা ঠিকমতো পানি দিতে পারছি না।

সংকটের উৎস বাংলাদেশের সীমানার অনেক বাইরে হলেও এর প্রভাব সরাসরি এখানে পড়ছে। ইউসুফ বলেন, ‘ইরানকে ঘিরে এই যুদ্ধ আমাদের ওপরও আঘাত হেনেছে। আমাদের মতো গরিব মানুষই সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে। আমরা শুধু এর শেষ চাই, যাতে শান্তিতে চাষবাস করে বাঁচতে পারি।

দুই সন্তানের বাবা ইউসুফ জানান, অনিশ্চয়তাই এখন তাদের নিত্যসঙ্গী। স্থানীয় একটি পাম্পের ম্যানেজার আবদুস সালাম বলেন, ‘এই মৌসুমে কৃষকদের প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন। আমরা সরকারি নির্দেশনা মেনে চলছি, কিন্তু আমরা যে পরিমাণ সরবরাহ পাচ্ছি তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।

তবে সব কৃষক এখনো সমানভাবে সংকটে পড়েননি। ৭৫ বছর বয়সী ওসমান আলী জানান, সংকট তীব্র হওয়ার আগেই তিনি কিছু তেল মজুত করে রেখেছিলেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি এভাবে চলতে থাকে তবে এই মজুত শেষ হয়ে যাবে। তখন সবাইকেই ভুগতে হবে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সেচ কাজের জন্য ডিজেল-চালিত পাম্প অপরিহার্য। চাষের শুরুতেই এই বিঘ্ন ঘটায় কৃষকরা আশঙ্কা করছেন যে, এর ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। ইউসুফের ভাষায়, ‘বিশ্বে কী ঘটছে তা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু এর মাশুল আমাদেরই দিতে হচ্ছে।

গ্রামবাংলায় সেচের জন্য ডিজেল এখনো অত্যাবশ্যক। মৌসুমের শুরুতেই ডিজেল সংকট দেখা দেওয়ায় খাদ্য উৎপাদন বাজারদরে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

রয়টার্স অবলম্বনে