ইসলামাবাদের আলোচনায় শান্তি কি আসবে মধ্যপ্রাচ্যে
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এক টেবিলে বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদে সম্ভাব্য এই আলোচনা ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। তবে একই সময়ে লেবাননে ইসরায়েলের টানা বিমান হামলা যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এক টেবিলে বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদে সম্ভাব্য এই আলোচনা ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। তবে একই সময়ে লেবাননে ইসরায়েলের টানা বিমান হামলা যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনার জন্য পাঁচতারকা হোটেল সেরেনা ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। প্রতিনিধিদলগুলোর অবস্থানও সেখানে হওয়ার কথা। নিরাপত্তা জোরদার করতে শহরে ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে, বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল-সরকারি অফিস।
এই আলোচনা এমন এক সময় হচ্ছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলেছে। তেলের সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখনও কার্যত বন্ধ রয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ১৫০ ডলারে পৌঁছেছে, জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে আরও বেশি।
তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হলে কোনো চুক্তিতে তারা রাজি হবে না। অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে না। এই অবস্থানগত দ্বন্দ্বই আলোচনার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেবাননে সাম্প্রতিক হামলাগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। একদিনেই ২৫০ জনের বেশি নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন পক্ষ এসব হামলাকে শান্তি প্রচেষ্টার জন্য ‘মারাত্মক ঝুঁকি’ হিসেবে দেখছে।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান চেষ্টা করছে লেবানন ও ইয়েমেন—দুই ফ্রন্টেই যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে, যাতে মূল আলোচনায় অগ্রগতি আসে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, মূল ইস্যুগুলোতেই দুই পক্ষের অবস্থান পুরোপুরি বিপরীত।
ইরান ১০ দফা প্রস্তাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছে। বিপরীতে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবে রয়েছে সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করার দাবি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আগের আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি প্রধান ইস্যু হলেও এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বে তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়ে যাওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তি না হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় থাকবে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে মাঠপর্যায়ে সংঘাত থামেনি।
ইসরায়েলের লক্ষ্যও আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। দেশটি ইরানকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুদ্ধবিরতির আওতা নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ইস্যুই এই আলোচনার সবচেয়ে দুর্বল দিক। এখানে সমাধান না হলে পুরো চুক্তিই ভেঙে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইরানও ইঙ্গিত দিয়েছে, হরমুজ প্রণালির অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্যবহার করে তারা দীর্ঘমেয়াদি চাপ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে, ইসলামাবাদের আলোচনায় শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাস্তবতা বলছে—মাঠের যুদ্ধ থামানো না গেলে কূটনৈতিক অগ্রগতি টেকসই হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এখন এই জটিল সমীকরণের সমাধানের ওপর।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এনবিসি নিউজ, আল জাজিরা