নতুন বিশ্বব্যবস্থা: আরও বিপজ্জনক, তবু বেশি সহযোগিতামূলক

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জমে ওঠা বৈপরীত্য, ব্যর্থতা ও দ্বিচারিতার মধ্য দিয়ে ভেঙে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ‘রুলস-বেইজড’ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা—ধীরে ধীরে, তারপর হঠাৎ করেই। ইরাক যুদ্ধ, বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ও মহামারির মতো ঘটনাগুলো এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতি, মিত্রদের হুমকি, আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা ও একতরফা সামরিক পদক্ষেপ—এই ভাঙনকে ত্বরান্বিত করেছে।

Apr 12, 2026 - 22:06
নতুন বিশ্বব্যবস্থা: আরও বিপজ্জনক, তবু বেশি সহযোগিতামূলক
নতুন বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে জৈব প্রযুক্তি, নতুন উদ্ভাবন যেমন অগ্রগতির পথ খুলছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন ধরনের হুমকি। ছবি: ব্লুমর্বাগ

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জমে ওঠা বৈপরীত্য, ব্যর্থতা দ্বিচারিতার মধ্য দিয়ে ভেঙে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভররুলস-বেইজডআন্তর্জাতিক ব্যবস্থাধীরে ধীরে, তারপর হঠাৎ করেই। ইরাক যুদ্ধ, বৈশ্বিক আর্থিক সংকট মহামারির মতো ঘটনাগুলো এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতি, মিত্রদের হুমকি, আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা একতরফা সামরিক পদক্ষেপএই ভাঙনকে ত্বরান্বিত করেছে।

দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র যেসব নীতিকে সামনে রেখে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিয়েছেভৌগোলিক অখণ্ডতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, মুক্ত বাণিজ্য মানবাধিকারসেগুলো এখন কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও এই কাঠামো সবসময় নিখুঁত ছিল না, তবুও এটি বিশ্বকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পূর্বানুমানযোগ্য রেখেছিল।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, বিশ্ব এখনগ্রেট আনরাভেলিংবা অরাজকতার দিকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়ান ব্রেমারের ভাষায়, এটিজঙ্গলের আইননির্ভর এক বিশ্ব, যেখানে শক্তিই ন্যায্যতা নির্ধারণ করে। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনাও সেই আশঙ্কাকে জোরদার করেছে।

তবে বাস্তবতা আরও জটিল। পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং একে বলেছিলেনজটিলতার শতাব্দী একক ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার জায়গায় এখন গড়ে উঠছে বিকেন্দ্রীকৃত, বহুমাত্রিক এক নেটওয়ার্কযেখানে বিভিন্ন রাষ্ট্র -রাষ্ট্রীয় শক্তি পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ এগিয়ে নিচ্ছে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থা বোঝার জন্য তিনটি বড় পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বৈশ্বিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টন। একসময় পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে কেন্দ্রীভূত শক্তি এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এশিয়া গ্লোবাল সাউথ’-এ। চীন, ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রযুক্তিগত উত্থান এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের বাইরে শক্তির উত্থান। বড় কোম্পানি, এনজিও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের সমান বা বেশি প্রভাবশালী। উদাহরণ হিসেবে, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের স্টারলিংকযুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য বহু দেশের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

তৃতীয়ত, বৈশ্বিক সংযোগের বিস্তার। রাজনৈতিক বক্তব্যেডিগ্লোবালাইজেশন’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ অভিবাসনসবই বাড়ছে। ফলে সহযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে সাইবার হামলা, মহামারি জলবায়ু সংকটের মতো আন্তঃসীমান্ত ঝুঁকিও।

আগে বিশ্ব বিভক্ত ছিল নির্দিষ্ট ব্লকেপুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র, পশ্চিম বনাম অন্যরা। এখন সেই কাঠামো ভেঙে গেছে। দেশগুলো এখন একাধিক শক্তির সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক গড়ে তুলছে, পরিস্থিতি অনুযায়ী জোট বদলাচ্ছে। এই বাস্তবতায় মধ্যম শক্তির দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। তারা বিভিন্ন ইস্যুতে ভিন্ন ভিন্ন জোট গড়ে তুলছে, যা একদিকে নমনীয়, অন্যদিকে কার্যকর।

বাণিজ্য, জনস্বাস্থ্য বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুতে এই নতুন বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামো আরও কার্যকর হতে পারে। বড় প্রতিষ্ঠানের বাইরে ছোট ছোট আঞ্চলিক বা দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ বাড়ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে বেশি বাস্তবসম্মত।

তবে নিরাপত্তা প্রশ্নে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব কমে যাওয়ায় আঞ্চলিক শক্তিগুলো আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছে। নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা পারমাণবিক বিস্তারের আশঙ্কা বাড়ছে।

বিশ্ব এখন এক নতুন বাস্তবতায়যেখানে সম্ভাবনা ঝুঁকি দুটোই বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে জৈব প্রযুক্তিনতুন উদ্ভাবন যেমন অগ্রগতির পথ খুলছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন ধরনের হুমকি।

সব মিলিয়ে, নতুন বিশ্বব্যবস্থা হবে এক বৈপরীত্যের মিশেলএকদিকে বেশি সহযোগিতা, অন্যদিকে বেশি অনিশ্চয়তা বিপদ। ইতিহাস এখানে নির্দিষ্ট কোনো পথ দেখাতে পারছে না; ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই জটিল ব্যবস্থায় মানবজাতি কতটা ভারসাম্য রাখতে পারে তার ওপর।

তথ্যসূত্র: ব্লুমবার্গ