নেতানিয়াহু ও ইসরায়েল নিয়ে মার্কিনিদের নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্যেই বিশ্ব রাজনীতিতে আরেকটি বড় বার্তা সামনে এসেছে—ইসরায়েল ও এর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন দ্রুত কমছে, দেশ-বিদেশ—দুই জায়গাতেই।

Apr 12, 2026 - 23:08
নেতানিয়াহু ও ইসরায়েল নিয়ে মার্কিনিদের নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে
তেল আবিবে নেতানিয়াহু-ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্যেই বিশ্ব রাজনীতিতে আরেকটি বড় বার্তা সামনে এসেছেইসরায়েল এর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন দ্রুত কমছে, দেশ-বিদেশদুই জায়গাতেই।

এপ্রিলের শুরুতে প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ মার্কিনি এখন ইসরায়েলের বিপক্ষেযা এক বছর আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর প্রতি আস্থা হারিয়েছেন ৫৯ শতাংশ মার্কিনি।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই অসন্তোষ বেশি। ডেমোক্র্যাট রিপাবলিকানউভয় শিবিরেই নেতানিয়াহু ইসরায়েল নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইসরায়েলের ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানে শাসন পরিবর্তন সম্ভবএমন বিশ্বাস ৭০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে প্রায় ৪৩ শতাংশে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইসরায়েলের সক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ বাড়ছে। একইভাবে, লেবাননের হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রশ্নেও বিভক্ত জনমত।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে একটি প্রশ্নমধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের নীতি কিআমেরিকা ফার্স্ট’, নাকিইসরায়েল ফার্স্ট’? মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউস নিজ দেশের স্বার্থের তুলনায় ইসরায়েলের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ধারণা জনমনে প্রভাব ফেলছে এবং আগামী নির্বাচনে তা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজা আরেফও সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইসরায়েলের নয়, নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াযা অনেক মার্কিনির মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধ ঘিরে তথ্যযুদ্ধেও পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন ফক্স নিউজ থেকে সরে গিয়ে অনেক মার্কিনি আন্তর্জাতিক মাধ্যমের দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে আল জাজিরার দর্শক সাবস্ক্রাইবার দ্রুত বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দশকে বৈশ্বিক তথ্যযুদ্ধে পশ্চিমা প্রচলিত মিডিয়ার একচেটিয়া প্রভাব কমতে পারে।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ বাড়ছে নেতানিয়াহুর ওপর। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, তাঁর দল লিকুদ পার্টির জনপ্রিয়তা কমছে এবং সম্ভাব্য নির্বাচনে বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি যেতে পারে। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিড অভিযোগ করেছেন, সামরিক সাফল্য থাকলেও কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। তাঁর ভাষায়, “জনগণ কষ্ট সহ্য করেছে, কিন্তু সরকার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

ইরান সংঘাতের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিশ্বদৃষ্টিকেও প্রভাবিত করবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক চাপ তৈরি করছে।

এদিকে বিশ্লেষণ বলছে, ইরান যুদ্ধ ইসরায়েলের জন্য ১৬ থেকে ৩২ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক চাপ তৈরি করেছেযা দীর্ঘমেয়াদে বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে, সামরিক অভিযান চালিয়েও কৌশলগত কূটনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি ইসরায়েলএমন মত বাড়ছে। বরং এই যুদ্ধ দেশটিকে একটি জটিল দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে আটকে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের ভাষায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করা এই অভিযানই এখন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকফাঁদহয়ে উঠছেযেখানে বিজয়ের দাবি যত জোরালো, বাস্তবতা ততটাই অনিশ্চিত।

ডালাস বার্তা ডেস্ক