ইরান সংকটে গ্যাসবাজারে নতুন ধাক্কা, বড় অস্থিরতার শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বৈশ্বিক গ্যাসবাজারে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর সবচেয়ে বড় অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ বা সীমিত হলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বৈশ্বিক গ্যাসবাজারে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর সবচেয়ে বড় অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ বা সীমিত হলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গ্যাস উৎপাদক কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর রপ্তানি বড় অংশেই নির্ভর করে হরমুজ প্রণালির ওপর। বৈশ্বিক এলএনজি রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্যে দেখা গেছে, প্রণালি ঘিরে নৌ-তৎপরতা বাড়ায় কাতারগামী ও কাতার থেকে ছেড়ে যাওয়া অন্তত ১১টি এলএনজি ট্যাংকার যাত্রা স্থগিত বা ধীর করেছে।
এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপ
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার গত বছর তাদের উৎপাদনের চার-পঞ্চমাংশের বেশি এশীয় বাজারে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন; দেশটির আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে কাতার থেকে। দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক ভারত।
এশিয়া ও ইউরোপ—দুই অঞ্চলের চালানই হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে যেতে হয়। ফলে জলপথে সামান্য বিঘ্নও সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এশিয়ার ক্রেতারা বিকল্প কার্গো পাওয়া যায় কি না—তা জানতে সরবরাহকারীদের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ শুরু করেছেন।
২০২২–এর পুনরাবৃত্তি?
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেলে আন্তর্জাতিক গ্যাসবাণিজ্যে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়। দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়, বিশেষ করে ইউরোপে। বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে একই ধরনের ঢেউ এশিয়াতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা।
উড ম্যাকেঞ্জির গ্যাস বিশ্লেষক টম মারজেক-ম্যানসার বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো নৌ-তৎপরতা বা কাতারের উৎপাদনে বিঘ্ন বাজারকে দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী করে বাংলাদেশ।
উৎপাদন ও শিপিং ঝুঁকি
২০২৫ সালে কাতার ৮২.২ মিলিয়ন টন এলএনজি রপ্তানি করেছে। তবে রাস লাফান শিল্পাঞ্চলের একটি উৎপাদন ইউনিটে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ চলায় প্রবাহ কিছুটা কমতে পারে। এছাড়া জাপানের বড় জাহাজমালিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এলএনজি ট্যাংকারকে প্রণালি এড়িয়ে নিরাপদ জলসীমায় অপেক্ষার নির্দেশ দিয়েছে।
সংকট দীর্ঘ হলে এলএনজি টার্মিনালগুলোতে ধারাবাহিক রপ্তানি ব্যাহত হবে। এতে উৎপাদন কমানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে, কারণ এসব স্থাপনায় জ্বালানি জমিয়ে রাখা কঠিন।
দামে নতুন চাপ
এলএনজির স্পট বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি শুরু হলে তা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ বেশিরভাগ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দামের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে তেলের দাম বাড়লে এশিয়ার ক্রেতাদের গ্যাস আমদানির খরচও বেড়ে যাবে।
আরেকটি চাপের জায়গা হতে পারে তুরস্ক। দেশটি ইরান থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি করে। সরবরাহ ব্যাহত হলে তাদের অতিরিক্ত এলএনজি কিনতে হতে পারে—যা বাজারে আরও চাহিদা বাড়িয়ে দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে টানাপোড়েন দ্রুত না কমলে ২০২২–এর মতো বৈশ্বিক গ্যাসবাজারে আবারও তীব্র অস্থিরতা দেখা দিতে পারে—বিশেষ করে এশিয়ায়, যেখানে কাতারের সরবরাহের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি।
তথ্যসূত্র: ব্লুমববার্গ