মুদি পণ্যের ক্রমবর্ধমান দামে চাপে মার্কিন ভোক্তারা
যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, শুল্কনীতি এবং আবহাওয়াজনিত সমস্যার কারণে চলতি গ্রীষ্মে মুদি পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, শুল্কনীতি এবং আবহাওয়াজনিত সমস্যার কারণে চলতি গ্রীষ্মে মুদি পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
সম্প্রতি মেমোরিয়াল ডে উপলক্ষে আয়োজিত বারবিকিউ ও পারিবারিক সমাবেশে অনেক ক্রেতাই বাজারে গিয়ে মূল্যবৃদ্ধির বাস্তব চিত্র দেখতে পেয়েছেন। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডেটাঅ্যাসেম্বলির তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে গরুর মাংসের হটডগের দাম বেড়েছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ, কিমা গরুর মাংস প্রায় ১৫ শতাংশ এবং সফট ড্রিংকের দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। বারবিকিউ সসের দামও বেড়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।
দেশটির বৃহত্তম মুদি পণ্য বিক্রেতা ওয়ালমার্ট জানিয়েছে, নিম্ন আয়ের অনেক ভোক্তা এখন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা জন ডেভিড রেইনি বলেন, ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের কারণে অনেক পরিবার বাজেট নিয়ে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে।
ফাস্টফুড জায়ান্ট ম্যাকডোনাল্ডসও ভোক্তাদের মধ্যে বাড়তে থাকা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রিস কেম্পচিনস্কি বলেন, উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ক্রেতাদের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে।
সর্বশেষ ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতির গতি আবারও বাড়ছে। এপ্রিল মাসে বাড়িতে ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যের দাম মার্চের তুলনায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। একই সময়ে বার্ষিক ভিত্তিতে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
বিশেষ করে তাজা ফল ও সবজির বাজারে চাপ বেড়েছে। এক মাসেই ফল ও সবজির দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। টমেটোর দাম ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি পাউন্ড ২ দশমিক ৬৮৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা রেকর্ড উচ্চতায় অবস্থান করছে।
ক্যালিফোর্নিয়া পলিটেকনিক স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষি ব্যবসা বিভাগের অধ্যাপক রিচার্ড ভলপি বলেন, ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার প্রভাব শুধু স্বল্পমেয়াদি নয়। তাঁর মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলেও এর প্রভাব গ্রীষ্মের শেষভাগ, শরৎকাল এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ২০২৭ সাল পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় অনুভূত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিই বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল জ্বালানির খুচরা মূল্য গত বছরের তুলনায় ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে খাদ্য পরিবহনের খরচও দ্রুত বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত সুপারমার্কেটের পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এদিকে কৃষকরাও বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের মুখোমুখি। সার, জ্বালানি এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে আমদানি পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভোক্তাদের কেনাকাটার ধরণও বদলে যাচ্ছে। অনেকেই এখন কম দামের বিকল্প পণ্য বেছে নিচ্ছেন, একাধিক দোকানে দাম তুলনা করছেন কিংবা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের পণ্য কিনছেন। গরুর মাংসের পরিবর্তে শূকরের মাংস বা অন্যান্য তুলনামূলক সস্তা খাদ্যের দিকেও ঝুঁকছেন অনেক পরিবার।
তবে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। বিশেষ করে যারা সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির সুবিধা হারিয়েছেন, তাদের জন্য খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। অনেক পরিবারকে এখন খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর যেভাবে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে ভোক্তাদের আচরণ বদলে দিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও তেমন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে সাশ্রয়ী পণ্যের চাহিদা আরও বাড়তে পারে, আর অনেক পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য কেনাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা, মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর কোনো বড় পরিবর্তন না এলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের জন্য এই গ্রীষ্ম হতে পারে আরও ব্যয়বহুল।
তথ্যসূত্র: ব্লুমবার্গ