লাগাতার লোকসানের মুখে কৌশল বদলাচ্ছে ফোর্ড মোটর

বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) ব্যবসায় লাগাতার ক্ষতির মুখে কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনছে মার্কিন গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ড মোটর। ২০২৫ সালে শুধু ইভি বিভাগেই ৪.৮ বিলিয়ন ডলার লোকসান হয়েছে কোম্পানিটির। ২০২৬ সালেও ৪ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা তাদের। আর ২০২৯ সালের আগে এ খাতে ব্রেক-ইভেন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা শেরি হাউস।

Feb 13, 2026 - 22:32
লাগাতার লোকসানের মুখে কৌশল বদলাচ্ছে ফোর্ড মোটর
২০২৫ সালে শুধু ইভি বিভাগেই ৪.৮ বিলিয়ন ডলার লোকসান হয়েছে ফোর্ড মোটরের। ছবি: এপি’র সৌজন্যে

বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) ব্যবসায় লাগাতার ক্ষতির মুখে কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনছে মার্কিন গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ড মোটর। ২০২৫ সালে শুধু ইভি বিভাগেই ৪.৮ বিলিয়ন ডলার লোকসান হয়েছে কোম্পানিটির। ২০২৬ সালেও ৪ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা তাদের। আর ২০২৯ সালের আগে এ খাতে ব্রেক-ইভেন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা শেরি হাউস।

টানা ক্ষতি, তবু আশাবাদ

২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ইভি ব্যবসায় ফোর্ডের মোট লোকসান ১৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে কোম্পানির মোট ক্ষতি ১১.১ বিলিয়ন ডলার এবং পুরো বছরে ৮.২ বিলিয়ন ডলার। তবে অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন (গ্যাসচালিত) গাড়ি ও বাণিজ্যিক সেবা খাতে শক্ত মুনাফা ইভির ক্ষতি আংশিক পুষিয়েছে।

২০২৬ সালে আর্থিক পারফরম্যান্সে উল্লেখযোগ্য উন্নতির আশা করছে ফোর্ড। সমন্বিত সুদ, কর ও অন্যান্য ব্যয়ের আগে আয় ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে; যেখানে ২০২৫ সালে তা ছিল ৬.৮ বিলিয়ন ডলার। যদিও প্রান্তিক আয়ে বাজারের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি কোম্পানি।

‘গ্রাহক কথা বলেছেন

কোম্পানির প্রধান নির্বাহী জিম ফার্লে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, `গ্রাহক কথা বলেছেনএটাই মূল বার্তা।‘ ২০২৫ সালে ফোর্ডের ইভি বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ কমেছে। ফোর্ড এফ-১৫০ লাইটনিং বিক্রি হয়েছে ২৭,৩০৭টি, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৮.৫ শতাংশ কম। আর ফোর্ড মাস্ট্যাং মাক-ই বিক্রি হয়েছে ৫১,৬২০টি, যা প্রায় স্থির।

ফেডারেল ৭,৫০০ ডলারের কর-সুবিধা শেষ হওয়ার পর বিক্রিতে বড় ধস নামে। এক বছরে লাইটনিংয়ের মাসিক বিক্রি ৫,১৯৭ ইউনিট থেকে নেমে ১,৭২৪-এ দাঁড়ায়।

শুরুর পরিকল্পনা কেন ব্যর্থ

ফোর্ড ছিল ঐতিহ্যবাহী মার্কিন গাড়িনির্মাতাদের মধ্যে অন্যতম, যারা শুরুতেই সরাসরি তেসলার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে। ২০২০ সালের শেষ দিকে টেসলা মডেল ওয়াই-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাজারে আসে ফোর্ড মাস্ট্যাং মাক-ই। ২০২২ সালে নিয়ে আসা হয় ফোর্ড এফ-১৫০ লাইটনিং।

শুরুর দিকে আগ্রহ ছিল প্রবললাইটনিংয়ের জন্য প্রায় দুই লাখ বুকিংয়ের কথা জানিয়েছিল কোম্পানিটি। বছরে ১.৫ লাখ বিক্রির লক্ষ্যও ধরা হয়েছিল। কিন্তু সেই গতি স্থায়ী হয়নি। উচ্চ মূল্য, রেঞ্জ ও টোয়িং ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ, এবং ভর্তুকি-নির্ভর চাহিদাসব মিলিয়ে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ইভি বিক্রি মন্থর হলেও হাইব্রিডের চাহিদা বেড়েছে। ২০২৫ সালে ফোর্ড ৮৪,৯৩৪টি হাইব্রিড এফ-১৫০ বিক্রি করেছে, যা ১৫ শতাংশ বেশি।

কৌশল বদল: হাইব্রিড ও কমদামি ইভি

পরিস্থিতি বদলে ফোর্ড এখন হাইব্রিডে জোর দিচ্ছে। পুরোপুরি বৈদ্যুতিক এফ-১৫০ লাইটনিং-এর উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে; ভবিষ্যতে এটি ‘এক্সটেন্ডেড-রেঞ্জ ইলেকট্রিক ভেহিকল হিসেবে ফিরবেব্যাটারিচালিত ট্রাকে থাকবে গ্যাস জেনারেটর, যা চলার পথে ব্যাটারি চার্জ করবে। এতে রেঞ্জ ও টোয়িং সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা কোম্পানির।

টেনেসিতে নির্মীয়মাণ কারখানায় আর ইলেকট্রিক ট্রাক নয়; সেখানে গ্যাসচালিত ট্রাক তৈরি হবে। ওহাইওতে বানানো হবে হাইব্রিড ও গ্যাসচালিত ডেলিভারি ভ্যান। দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাটারি অংশীদার এসকে অনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগও শেষ করেছে ফোর্ড; কেনটাকির একটি কারখানার পূর্ণ মালিকানা নিয়েছে তারা।

একই সঙ্গে নতুন ‘ইউনিভার্সাল’ ইভি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে ফোর্ডকম খরচে বেশি সংখ্যায় গাড়ি উৎপাদনের লক্ষ্যে। প্রথম মডেল হিসেবে ২০২৭ সালে প্রায় ৩০ হাজার ডলার দামের মাঝারি আকারের পিকআপ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্ল্যাটফর্মে অন্তত পাঁচটি মডেলএসইউভি ও বাণিজ্যিক ভ্যানও থাকতে পারে।

শিল্পখাতে প্রবণতা

শুধু ফোর্ড নয়, অন্যান্য বড় নির্মাতারাও ৫০ হাজার ডলারের নিচে ইভি আনার পরিকল্পনা করছে। তবু ফোর্ডের হিসাব বলছে, ইভি বিভাগ কয়েক বছর লাল সংকেতেই থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে আয়ে ধাক্কা থাকলেও ২০২৬ সালে নগদ প্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়ার ইঙ্গিত বাজারের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

শুরুতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার কৌশল ব্যয়বহুল হয়েছে। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন লক্ষ্য কোম্পানিকে লোকসানের ধারা থেকে বের করে নিয়ে আসা। কমদামি প্ল্যাটফর্ম এবং হাইব্রিড-ভিত্তিক বাস্তববাদী পরিকল্পনায় এগিয়ে চলা। ২০২৯ সালের আগে ইভি খাতে সমতা না এলেও, পুনর্গঠনের এ পথেই ভবিষ্যৎ দেখছে কোম্পানিটি।

তথ্যসূত্র: বিজনেস ইনসাইডার