টাইমের প্রতিবেদন: তারেক রহমানের সামনে পাঁচ বড় চ্যালেঞ্জ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ইঙ্গিত মিলতেই আন্তর্জাতিক মহলেও তাঁর নেতৃত্ব ঘিরে আগ্রহ বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী হলে কী কী হবে তাঁর অগ্রাধিকার?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ইঙ্গিত মিলতেই আন্তর্জাতিক মহলেও তাঁর নেতৃত্ব ঘিরে আগ্রহ বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী হলে কী কী হবে তাঁর অগ্রাধিকার?
জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম’ তাঁর অগ্রাধিকার জানতে চাইলে প্রথমে আইনের শাসন, তারপর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, আর তৃতীয়ত জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছিলেন তারেক রহমান। জোর দিয়েছেন ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওপরও। কারণ তিনি মনে করেন ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই দেশকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
আস্থা ফিরিয়ে জাতীয় ঐক্য
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু এবং আগের দেড় দশকে গুম-নির্যাতনের অভিযোগ—রাজনীতির মাটিতে গভীর ক্ষত রেখে গেছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় রাজনৈতিক মেরুকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিকরণের অভিযোগ ছিল। সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, সিভিল সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠন এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর সহিংসতার স্মৃতি এখনও আলোচিত। ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশে ফেরার পর তারেক রহমান প্রতিহিংসা নয়, সংযম ও ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, প্রতিশোধ নয়—ঐক্যই দেশকে এগিয়ে নিতে পারে।
অর্থনীতির মেরামত ও কর্মসংস্থান
গত এক দশকে বাংলাদেশের জিডিপি দ্রুত বেড়েছে—২০০৬ সালের ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২২ সালে ৪২০ বিলিয়নে। তবে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন, বৈষম্য ও বেকারত্ব জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে এলেও যুব বেকারত্ব ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি নিয়ন্ত্রণ জ্বালানি ও শিল্পে চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রায় ৪ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যে। বিএনপি নারীদের ভাতা ও বেকারদের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও অর্থায়নের পথ স্পষ্ট নয়। তারেক ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং খাত উদারীকরণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশগামী শ্রমিকদের আয় বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলেছেন।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্য
রপ্তানি টেকসই করতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো জরুরি। শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ কয়েকটি অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে। বিএনপি ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ ওয়াটার কনভেনশনের আলোকে ‘ন্যায্য হিস্যা’ দাবি করে আসছে। তারেকের মতে, আগের চুক্তিগুলোর কিছু সংশোধন প্রয়োজন—প্রতিবেশী সম্পর্ক বজায় রেখেও জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে আলোচনার মাধ্যমে। এর বিনিময়ে বাজার আরও উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা। কিছু টেক্সটাইল পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা মিলেছে। তবে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও আরও শুল্ক ছাড় আদায়ে আলোচনা অব্যাহত রাখতে চান তারেক—সম্ভাব্যভাবে মার্কিন জ্বালানি ও উড়োজাহাজ ক্রয়ের মতো কৌশলগত কেনাকাটার মাধ্যমে।
ইসলামপন্থীদের উত্থান সামলানো
এই নির্বাচনে আসনসংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শরিয়াহভিত্তিক লক্ষ্য থাকলেও দলটি এখন সামাজিক কল্যাণ ও ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ পরিচয়ে জোর দিচ্ছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, আদর্শিক অবস্থান পুরোপুরি বদলায়নি। অতীতে বিএনপির জোটসঙ্গী থাকলেও এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে ইসলামপন্থীদের প্রভাব সীমিত থাকবে—এমন ধারণা আছে। তবু ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাদের গুরুত্ব অস্বীকার করা যাচ্ছে না। তারেকের বক্তব্য, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব দলের ঐক্যবদ্ধ কাজ জরুরি।
শিক্ষার্থী ও তরুণ রাজনীতির প্রত্যাশা
কোটা সংস্কার ইস্যুতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। তবে ছাত্রনেতাদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি–এর জোটরাজনীতি নিয়ে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। অনেক তরুণ প্রচলিত দলের আধিপত্যে হতাশ। বিশেষত জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা নারীরা সংস্কার প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব না পাওয়ার অভিযোগ তুলছেন।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের প্রতি তাঁর দায় আছে। তাঁর সামনে তাই একসঙ্গে পাঁচটি ফ্রন্ট—প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনীতি চাঙ্গা করা, কূটনৈতিক ভারসাম্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ কমানো এবং তরুণ প্রজন্মের আস্থা অর্জন। সফল হলে নতুন অধ্যায়; ব্যর্থ হলে প্রত্যাশার ভারই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
(সংক্ষেপিত ভাষান্তর)