ডালাসের ‘টকঝাল’-এ বাংলাদেশের ফুচকা, চাকরির ফাঁকে স্বপ্ন বোনা দুই তরুণের গল্প

ডালাসের বাংলাদেশি তরুণদের আড্ডার নতুন ঠিকানা হয়ে উঠেছে ‘টকঝাল’। গল্পটা শুরু হয়েছিল একদম সাধারণ এক সন্ধ্যা থেকে, আর এখন তা হয়ে উঠেছে কমিউনিটির প্রিয় জায়গা, যেখানে মানুষ ফিরে পায় বাংলাদেশের স্বাদ আর আপনত্ব।

Nov 19, 2025 - 16:58
ডালাসের ‘টকঝাল’-এ বাংলাদেশের ফুচকা, চাকরির ফাঁকে স্বপ্ন বোনা দুই তরুণের গল্প
শিহাব ও শাফকাত।

ডালাসের বাংলাদেশি তরুণদের আড্ডার নতুন ঠিকানা হয়ে উঠেছে ‘টকঝাল’। গল্পটা শুরু হয়েছিল একদম সাধারণ এক সন্ধ্যা থেকে, আর এখন তা হয়ে উঠেছে কমিউনিটির প্রিয় জায়গা, যেখানে মানুষ ফিরে পায় বাংলাদেশের স্বাদ আর আপনত্ব।

২০২৪ সালের রমজান মাসে ডালাসের এক মসজিদে ইফতারের আয়োজনে প্রথম দেখা হয় দুই তরুণ—শাফকাত ও শিহাবের। বয়সে কাছাকাছি, চিন্তাভাবনাতেও মিল ছিল প্রবল। ইফতারের টেবিলে শুরু হওয়া আলাপ ধীরে ধীরে রূপ নেয় বন্ধুত্বে। ইফতারের পর প্রায়ই তারা দেখা করতেন ‘হ্যালো ইন্ডিয়া’ নামের এক রেস্তোরাঁয়, যেখানে আড্ডার ফাঁকে জন্ম নেয় এক নতুন ভাবনা—“বাংলাদেশিদের জন্য এমন কোনো জায়গা নেই কেন, যেখানে তরুণরা বসে গল্প করবে, চা খাবে, স্ন্যাকস খাবে, সময় কাটাবে?”

শাফকাত সামিন আনোয়ার পেশায় সাংবাদিক, বর্তমানে যুক্ত আছেন দ্য ডালাস মর্নিং নিউজ–এর সঙ্গে। শিহাব জামান তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত একজন বিজনেস অ্যানালিস্ট। ব্যস্ত পেশাগত জীবনের মাঝেও দুজনের মধ্যে ছিল একটাই লক্ষ্য—এই ভাবনাটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয় “টকঝাল”—একটি ছোট খাবারের দোকান, যা অল্প সময়েই পরিণত হয় ডালাসের বাংলাদেশি তরুণদের প্রিয় আড্ডাখানায়।

খাবার হিসেবে তারা বেছে নেন ফুচকা। কারণও বেশ ব্যক্তিগত। শিহাব আগে থাকতেন নিউ জার্সির আটলান্টিক সিটিতে, যেখানে বাঙালিদের খাবার পাওয়া ছিল দুষ্কর। প্রিয় ফুচকা খেতে প্রতি সপ্তাহেই আড়াই ঘণ্টা ড্রাইভ করে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে যেতে হতো তাঁকে। রাত ৯টায় রওনা হয়ে রাত তিনটার দিকে ফিরতেন শুধুই সেই স্বাদের টানে। ডালাসে এসে একই অভাব অনুভব করেন তিনি—পানিপুরি পাওয়া যায়, কিন্তু ফুচকা নয়। অথচ ফুচকা তো বাঙালির সংস্কৃতিরই এক অংশ! তাই সিদ্ধান্ত—ফুচকার দোকানই হবে তাদের শুরু। আর সেই সিদ্ধান্ত থেকেই টকঝাল হয়ে ওঠে ডালাসের প্রথম ফুচকার দোকান, যেখানে পাওয়া যায় খাঁটি বাংলাদেশের ফুচকা ও চটপটি।

২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে টকঝাল। তার এক মাস আগে থেকেই সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চলছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই টকঝাল দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রায় সব বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক ইভেন্টে টকঝালের উপস্থিতি দেখা যায়। শুধু তাই নয়, জন্মদিন, বিয়ে, বেবি শাওয়ার—সব ধরনের প্রাইভেট ইভেন্টেও তারা এখন ‘লাইভ ফুচকা সার্ভিস’ দিয়ে থাকেন। এমনকি অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণার মাধ্যমে ‘ফ্রি ফুচকা’ অফারও দেন।

ব্যবসার শুরুর সময়টা মোটেও সহজ ছিল না। পূর্ণকালীন চাকরির পাশাপাশি এই উদ্যোগ চালানো ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। প্রথম দুই–তিন মাসে গ্রাহকদের ভিড় সামলানোই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। প্রতিদিন শতাধিক মানুষ ফুচকা খেতে আসতেন। উদ্যোক্তারা জানান, শুরুতে এক আন্টি শেফ হিসেবে কাজ করতেন; সেখান থেকেই ফুচকা এনে নিজেরাই সার্ভ করতেন তারা।

তাদের ভাষায়, “ফুচকা ভাজা আসলে ধৈর্যের পরীক্ষা। তিন–চার হাজার ফুচকা একসঙ্গে ভাজা—এটা সত্যিই কঠিন কাজ।” চাকরির ফাঁকে সময় বের করা সহজ ছিল না, তবু ভালোবাসা ও আগ্রহই টকঝালকে টিকিয়ে রেখেছে আজ পর্যন্ত।

শুধু অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ নয়, বাইরের বাধাও ছিল অনেক। টকঝাল যে ডালাসে একমাত্র ফুচকার দোকান, সেটি কমিউনিটিতে জানানোই ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ। দোকানটি এমন এলাকায় যেখানে ভারতীয়দের সংখ্যা বেশি। তাদের অনেকেই পানিপুরির স্বাদে অভ্যস্ত ছিলেন। “তাঁরা পানিপুরি অর্ডার করত। আমরা তাদের বলতাম এটা বাংলাদেশের পানিপুরি। কিন্তু এটা যখন তারা হাতে পেত, তাদের অনেকেই হতাশ হতো।,” জানালেন শাফকাত, “আমরা তখন বলতাম, আগে খেয়ে দেখুন, ভালো না লাগলে টাকা দেবেন না।” এই এক চেষ্টাতেই বদলে যায় সব। ধীরে ধীরে ভারতীয় এবং এমনকি আমেরিকান গ্রাহকরাও ফুচকার ভক্ত হয়ে ওঠেন।

টকঝালের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার ফুচকা। তার পরেই আছে ঝালমুড়ি। ফুচকার মতো ঝালমুড়ির তেমন প্রচারণা না হলেও, অনেক জায়গায় এখন ঝালমুড়িই ফুচকার মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। উদ্যোক্তাদের একজন বলেন, “ফুচকা আমাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়, কিন্তু অনেকে শুধু ঝালমুড়ির জন্যই এখানে আসেন।” ফুচকার স্বাদ নিয়ে প্রথমদিকে অভিযোগ থাকলেও, এখন তার স্বাদ বাংলাদেশের ফুচকার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের কাছাকাছি বলে দাবি উদ্যোক্তাদের। প্রতিদিন তাঁরা নতুন কিছু যুক্ত করার চেষ্টা করছেন—চিকেন চাপ, লুচি, বিফ চাপসহ এমন কিছু আইটেম আনছেন যা যুক্তরাষ্ট্রে সহজলভ্য নয় কিন্তু বাংলাদেশিদের প্রিয়।

টকঝালকে কেবল খাবারের ব্যবসা নয়, বরং বাংলাদেশের সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই দেখেন তারা। “টকঝাল স্বতন্ত্র একটা কালচার, আর এটা বাংলাদেশি কালচার। আমরা যখন মানুষকে ফুচকা খাওয়াই, আমাদের চেষ্টা থাকে এটা মুখে দিয়ে তারা যেন বাংলাদেশে ফিরে যায়।” বললেন শিহাব। “আমরা চাই মানুষ যখন ফুচকা খাবে, তখন তার মনে পড়বে বাংলাদেশের কথা—স্কুলের দিনগুলো, নিউমার্কেটের ফুচকা, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা।” অনেকেই এসে বলেন, “এই তো! খুঁজছিলাম এমন কিছুই।”

এক বছর পূর্তিতে টকঝাল আয়োজন করতে যাচ্ছে বিশেষ কিছু। যদিও তারিখ এখনো ঠিক হয়নি, উদ্যোক্তারা জানালেন—“এখানকার সব প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য খুবই বিশেষ আয়োজন থাকবে, যা প্রথমবারের মতো ডালাসবার্তায় ঘোষণা করছি।”

টকঝালের নতুন ঠিকানা প্লেনোতে। গত অক্টোবরের ১২ তারিখ থেকে তারা আর আরভিং লোকেশনে বসছেন না। “প্লেনোর সবাইকে জানাচ্ছি, আমরা আসছি,” জানালেন তাঁরা।

শিহাব ও সাফকাতের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা নয়—তারা এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চেয়েছেন, যেখানে তরুণরা আসবে, আড্ডা দেবে, সময় কাটাবে, নিজেদের গল্প ভাগ করবে। এক বছরের মধ্যেই টকঝাল শুধু একটি খাবারের দোকান নয়, হয়ে উঠেছে এক ধরনের কমিউনিটি ব্র্যান্ড। উদ্যোক্তারা হাসতে হাসতে বলেন, “আগে এখানে খুব বেশি পরিচিত কেউ ছিল না আমাদের। এখন সিনেমা দেখতে গেলে, ঈদের নামাজে বা কোনো অনুষ্ঠানে গেলেই সবাই জিজ্ঞেস করে—‘টকঝাল কই?’

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য তাদের পরামর্শ সহজ—“শুরু করুন, কিন্তু ধৈর্য ধরুন। শুরুতেই বেশি খরচ নয়, আগে বুঝে এগোন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ব্যবসাটাকে ভালোবাসতে হবে। চাকরির মতো নয়, এটা হবে জীবনের আনন্দ।”