ইরান সংকটে সাময়িক স্বস্তি, পুরোপুরি কাটেনি উত্তেজনা
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হত্যাকাণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ হয়েছে—এমন আশ্বাস পাওয়ার দাবি করে সামরিক পদক্ষেপ থেকে আপাতত সরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনো ‘অত্যন্ত নাজুক’ বলেই মনে করছেন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকেরা। বিক্ষোভ দমন, পাল্টা হুমকি, শেষ মুহূর্তের উপসাগরীয় কূটনীতি, মার্কিন সামরিক তৎপরতা ও তেলের দামে বড় পতন—সব মিলিয়ে ইরান ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো বহুমাত্রিক।
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হত্যাকাণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ হয়েছে—এমন আশ্বাস পাওয়ার দাবি করে সামরিক পদক্ষেপ থেকে আপাতত সরে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনো ‘অত্যন্ত নাজুক’ বলেই মনে করছেন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকেরা। বিক্ষোভ দমন, পাল্টা হুমকি, শেষ মুহূর্তের উপসাগরীয় কূটনীতি, মার্কিন সামরিক তৎপরতা ও তেলের দামে বড় পতন—সব মিলিয়ে ইরান ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো বহুমাত্রিক।
বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘নির্ভরযোগ্য সূত্র’ থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে যে ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় তা তিনি পর্যবেক্ষণ করবেন, তবে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প একেবারে নাকচ করেননি। ট্রাম্পের এই বক্তব্য আসে এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র–ইরান নতুন করে সংঘাতে জড়াতে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যে কাতারের একটি বড় মার্কিন বিমানঘাঁটি থেকে কিছু সেনাসদস্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
তেহরানও প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান জানাতে ছাড়েনি। ইসলামিক বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কোনো ‘ভুল হিসাব’ করলে ইরান ‘উপযুক্ত জবাব’ দিতে প্রস্তুত। তিনি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের পেছনে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে দায়ী করেন। তবে একই দিনে মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়ার ‘কোনো পরিকল্পনাই নেই’। তাঁর দাবি, কঠোর দমনের পর সরকার এখন পরিস্থিতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
শেষ মুহূর্তের উপসাগরীয় কূটনীতি
এই উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি আরব, কাতার ও ওমান শেষ মুহূর্তে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক হামলা থেকে বিরত রাখা গেছে বলে জানিয়েছেন সৌদি আরবের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে ট্রাম্প ইরানকে ‘আরেকটি সুযোগ’ দিতে রাজি হন। উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে জানিয়েছে—ইরানে আক্রমণ হলে তা পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেবে, জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করবে এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে হামলার অনুমতি দেবে না। একই সঙ্গে তেহরানকে জানানো হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় হামলা চালালে তার সরাসরি কূটনৈতিক মূল্য দিতে হবে।
নিহতের সংখ্যা ও ইন্টারনেট শাটডাউন
ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর মুদ্রার দরপতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভ দমনে গুলি চালানোর পর দেশটির ৩১টি প্রদেশের প্রায় ১৯০টি শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রায় সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়—নেটব্লকসের হিসাবে, শাটডাউন ১৪৪ ঘণ্টা ছাড়িয়েছে।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। সরকার স্বীকার করেছে, শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির দাবি, নিহত বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ৩ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, গত এক সপ্তাহে ‘নজিরবিহীন মাত্রায় বেআইনি হত্যাকাণ্ডের’ প্রমাণ তারা পেয়েছে, যার বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও পথচারী।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে প্রকাশিত কিছু ভিডিও ও ছবিতে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে পোড়া গাড়ি, অস্থায়ী মর্গে লাশের সারি এবং স্বজনদের ভিড় দেখা যাচ্ছে।
সামরিক তৎপরতা ও বাজারের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হুমকি থেকে খানিকটা সরে আসার ইঙ্গিত দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে বড় সংঘাতের আশঙ্কা কিছুটা কমে আসে। এর প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। একদিনেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়। ব্রেন্ট ক্রুড নেমে আসে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৪ ডলারে, ডব্লিউটিআই দাঁড়ায় প্রায় ৫৯ ডলারে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার সামরিক অভিযানের পথে হাঁটে, তাহলে তেলের দামে হঠাৎ বড় উল্লম্ফন হতে পারে। তবে বৈশ্বিক সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় মধ্যমেয়াদে দাম আবার চাপের মুখে পড়তে পারে।
অনিশ্চিত বিরতি
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের আশ্বাসের দাবি ও উপসাগরীয় কূটনীতিতে আপাতত বড় সংঘাত এড়ানো গেলেও ইরান সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো দূরে। মাঠে বিক্ষোভের বাস্তবতা, তেহরান–ওয়াশিংটনের পারস্পরিক হুঁশিয়ারি এবং চলমান সামরিক প্রস্তুতি—সবকিছু মিলিয়ে এই ‘বিরতি’ যে খুবই ভঙ্গুর, সে বিষয়ে একমত কূটনীতিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
তথ্যসূত্র: এএফপি, আল জাজিরা, ফক্স নিউজ, বিবিসি