ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলায় ঝুঁকিতে চীনের বিলিয়ন ডলারের স্বার্থ
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে দেশটিতে নিজেদের বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষাকে বেইজিং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে দেশটিতে নিজেদের বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষাকে বেইজিং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাতের হামলার পরপরই চীন ‘চরম উদ্বেগ’ প্রকাশ করে এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মুক্তি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানায়। বেইজিং সংকট সমাধানে সংলাপের পথ বেছে নেওয়ার তাগিদও দেয়।
এক ব্রিফিংয়ে সোমবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, ভেনেজুয়েলার সরকারের সঙ্গে চীনের ‘ইতিবাচক যোগাযোগ ও সহযোগিতা’ অব্যাহত আছে। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, তেলসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ অপরিবর্তিত থাকবে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে আইনের আওতায় চীনা স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন লিন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা বিশ্বমঞ্চে চীনকে ‘স্থিতিশীলতার শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দিলেও দেশটিতে চীনের বড় বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বেইজিংভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের গবেষক জিচেন ওয়াং বলেন, ভেনেজুয়েলায় চীনের বিপুল বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে, অনিশ্চয়তা লাতিন আমেরিকা জুড়েই চীনা ব্যবসায় প্রভাব ফেলতে পারে।
গত দুই দশকে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীনা কোম্পানিগুলো। যার বেশির ভাগই মূলত জ্বালানি খাতে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সিএনপিসির সঙ্গে ভেনেজুয়েলার পিডিভিএসএর যৌথ উদ্যোগ রয়েছে। গত আগস্টে চায়না কনকর্ড রিসোর্সেস কর্পোরেশন ২০২৬ সালের মধ্যে দৈনিক ৬০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদনের লক্ষ্যে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
চীনা নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তাই এখন বেইজিংয়ের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানান রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দং শাওপেং। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কোনো চীনা নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
চীন এটিকে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ ও ‘দাদাগিরি’ বলে আখ্যা দিয়ে লাতিন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। বেইজিং জানায়, তারা অ-হস্তক্ষেপ নীতি অনুসরণ করে এবং আদর্শিক বিভাজন টানে না।
তবে তেল বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট। ভেনেজুয়েলার তেল চীনের প্রধান গন্তব্য হলেও ২০২৪ সালে চীনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতে দেশটির অংশ ছিল মাত্র ২ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি অনেক বেশি।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অর্থনীতিবিদ ইউয়ে সু বলেন, ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সীমিত হওয়ায় চীন এই সংঘাতে সরাসরি জড়াতে চাইবে না। বরং তাইওয়ান প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান না নিলে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে বেইজিং।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলা সংকট চীনের তাইওয়ান নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে মাদুরোর বিরুদ্ধে আইনি যুক্তি দাঁড় করিয়েছে, তা ভবিষ্যতে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের আইনি কাঠামো ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এর মধ্যেই চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সোমবার প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং পরে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকেও বসার কথা ছিল।
তথ্যসূত্র: সিএনবিসি