ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ ব্যবস্থাপনাও থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য নিয়ন্ত্রণ নিতে এক বিস্তৃত পরিকল্পনার ‘ন্যূনতম’ পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বুধবার একাধিক মন্ত্রিসভার কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই ভেনেজুয়েলার উৎপাদিত তেল নিজেই বাজারজাত করবে—এমনকি বিক্রির অর্থ ব্যবস্থাপনাও ওয়াশিংটনের হাতে থাকবে।
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য নিয়ন্ত্রণ নিতে এক বিস্তৃত পরিকল্পনার ‘ন্যূনতম’ পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বুধবার একাধিক মন্ত্রিসভার কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই ভেনেজুয়েলার উৎপাদিত তেল নিজেই বাজারজাত করবে—এমনকি বিক্রির অর্থ ব্যবস্থাপনাও ওয়াশিংটনের হাতে থাকবে।
এই পরিকল্পনার বিস্তারিত ধীরে ধীরে সামনে আসে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন—ভেনেজুয়েলা খুব শিগগিরই কোটি কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে। পরে প্রশাসনের কর্মকর্তারা দিনভর সেই ঘোষণার ফাঁকফোকর পূরণ করার চেষ্টা করেন।
পরিকল্পনাটি যেমন সাহসী, তেমনি খুঁটিনাটি দিক থেকে অসম্পূর্ণ। সাম্প্রতিক ইতিহাসে কোনো মার্কিন সরকার এককভাবে অন্য দেশের তেল রপ্তানির ওপর এমন সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়নি। একসময় ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহারে জাতিসংঘ-নিয়ন্ত্রিত ‘অয়েল-ফর-ফুড’ কর্মসূচি ছিল, তবে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের একক ব্যবস্থাপনায় ছিল না।
বুধবার বিকেলে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে—এমন দাবি তারা নিশ্চিত করেনি। ভেনেজুয়েলায় তেলকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখা হয়; বিদেশি সরকার ও কোম্পানির প্রভাব সীমিত রাখা দেশটির রাজনীতির দীর্ঘদিনের অবস্থান।
ক্যাপিটলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আমরা এমন একটি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে, যেখানে সব তেলই নেওয়া হবে।’ এর আগে জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানান, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায় এবং ‘অনির্দিষ্টকাল’ উৎপাদিত তেলের বিক্রি তদারক করবে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের এক জ্বালানি সম্মেলনে রাইট বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা থেকে যে তেল উৎপাদিত হবে, আমরা সেটাই বাজারে বিক্রি করব।’ রুবিও জোর দিয়ে বলেন, প্রশাসন হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না; বরং পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলো যেন ‘ন্যায্যভাবে’ ভেনেজুয়েলার বাজারে প্রবেশাধিকার পায়, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ এক তথ্যপত্রে জানায়, তেল বিক্রি সহজ করতে নিষেধাজ্ঞা ‘নির্বাচিতভাবে’ শিথিল করা হবে। ইতোমধ্যে পণ্য ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের সহায়তায় তেল বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নির্দেশ করে। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও আংশিক অবরোধের ফলে দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানি মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। এতে সরকারের রাজস্ব কমে যায় এবং বিপুল পরিমাণ তেল মজুত ও সমুদ্রে নোঙর করা জাহাজে আটকে থাকে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেসন বোর্ডফ একে ‘প্রাচীন যুগের ছাড় ও সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণের স্মৃতি জাগানো’ ব্যবস্থা বলে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজারে তেল বিক্রির একমাত্র পথ যদি হয়—যুক্তরাষ্ট্রকে শিল্প চালাতে দেওয়া ও সৃষ্ট সম্পদের বড় অংশ ছেড়ে দেওয়া—তবে তা সাম্প্রতিক তেলবাজারের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এমন নিয়ন্ত্রণের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসন কোন ক্ষমতাবলে তেলের অর্থ ব্যবহার করবে—তা স্পষ্ট নয়। সংবিধান অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সরকারি অর্থ ব্যয় করা যায় না।
চুক্তির অবস্থান নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। রুবিও বলেছেন, চুক্তি খুব কাছাকাছি; হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স দাবি করেন, দুই পক্ষ ইতোমধ্যে সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে পিডিভিএসএ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যমান কাঠামোর অনুরূপ প্রক্রিয়ায় আলোচনা চলছে।
ভেনেজুয়েলার সরকার বা পিডিভিএসএ কেউই এখনো নিশ্চিত করেনি, তেল বিক্রির অর্থের নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের হাতে দেওয়া হবে কি না। এমনকি চুক্তি হলেও তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে বলে মনে করেন স্ট্যানফোর্ডের আন্তর্জাতিক আইন কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেন এস. ওয়েইনার। তাঁর ভাষায়, ‘বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাধ্য হয়ে করা চুক্তি বৈধ নয়’—যদিও তা কার্যকর করা কঠিন।
এদিকে শুক্রবার হোয়াইট হাউসে শেভরনসহ বড় পশ্চিমা তেল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প। সরকারের লক্ষ্য—বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ানো। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৫৬ ডলারে নেমেছে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নের কাছাকাছি।
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস