স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে বিভিন্ন দেশ, কিন্তু কেন
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ও চাহিদায় নজিরবিহীন উত্থান দেখা যাচ্ছে। একসময় প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২ হাজার ডলারের সীমায় আটকে থাকলেও এখন তা বহু গুণ বেড়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালজুড়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই দামের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ও চাহিদায় নজিরবিহীন উত্থান দেখা যাচ্ছে। একসময় প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২ হাজার ডলারের সীমায় আটকে থাকলেও এখন তা বহু গুণ বেড়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালজুড়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই দামের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
এই উত্থান হঠাৎ নয়; বরং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সম্মিলিত প্রভাব। ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলার-ইউরোর বিকল্প হিসেবে স্বর্ণ মজুত বাড়াচ্ছে।
ডলার থেকে স্বর্ণে ঝোঁক কেন
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ জব্দ করে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ডলার বা ইউরোতে রিজার্ভ রাখা রাজনৈতিক ঝুঁকিমুক্ত নয়। এই ঘটনাই অনেক দেশের জন্য ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর থেকেই বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। কারণ স্বর্ণ কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এবং সহজে জব্দযোগ্যও নয়। ফলে বৈদেশিক রিজার্ভের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চাহিদা বাড়ার পেছনে ভূ-রাজনীতি
বিশ্বে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, স্বর্ণের চাহিদাও তত বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আদাম গ্লাপিনস্কি বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতাই এখন অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
টানা তিন বছর ধরে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে এক হাজার মেট্রিক টনের বেশি স্বর্ণ রিজার্ভে যোগ করেছে—যা আধুনিক ইতিহাসে বিরল।
কোন দেশ কতটা এগোচ্ছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, ভারত, তুরস্ক ও পোল্যান্ড বড় ক্রেতা হিসেবে উঠে এসেছে। অন্তত ১৮টি দেশ তাদের স্বর্ণ মজুত বাড়িয়েছে। কিছু দেশ আবার তাদের রিজার্ভের বড় অংশই স্বর্ণে রূপান্তর করেছে—যেমন উজবেকিস্তান ও ভেনেজুয়েলা।
চেক প্রজাতন্ত্রও নতুন করে স্বর্ণ কেনা শুরু করেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা ইয়ান কুবিচেক জানান, কয়েক বছর আগেও স্বর্ণকে ‘সেকেলে’ মনে করা হতো, কিন্তু এখন সেটিই কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।
কেন স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ মজুত বাড়ানোর পেছনে কয়েকটি মূল কারণ কাজ করছে। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক ঝুঁকির সময়ে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়। মুদ্রাস্ফীতির সময় স্বর্ণ মূল্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। ডলার-ইউরোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রিজার্ভ বৈচিত্র্য আনা যায়। এখানেই শেষ নয়, নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ জব্দের ঝুঁকি কম থাকে এবং জরুরি সময়ে দ্রুতই স্বর্ণকে নগদে রূপান্তর করা যায়।
বাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
বর্তমানে বৈশ্বিক স্বর্ণের চাহিদা ও মূল্য—দুইই রেকর্ড উচ্চতায়। খুচরা বিনিয়োগ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক—সবখানেই চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে এশিয়ার বাজার এই প্রবণতার নেতৃত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের স্বর্ণের এই উত্থান শুধু একটি পণ্যের দাম বাড়ার গল্প নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের ইঙ্গিত। একক মুদ্রাভিত্তিক বিশ্ব থেকে ধীরে ধীরে বহুমুখী আর্থিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব, যেখানে স্বর্ণ আবারও কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র: সিবিএস নিউজ, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস