ধর্মের নামে নৃশংসতা: পিটিয়ে হত্যা, তারপর লাশে আগুন
তখনও শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ঢাকায় এসে পৌঁছেনি। জুলাই বিপ্লবী হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সুযোগ সন্ধানী এক দল লোক তখনও হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ের ওপর।
তখনও শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ঢাকায় এসে পৌঁছেনি। জুলাই বিপ্লবী হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সুযোগ সন্ধানী এক দল লোক তখনও হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ের ওপর।
তবে তখন মানুষরূপী ‘পশু’র আরেক দল তাণ্ডব চালিয়েছে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলোর স্কয়ার মাস্টার বাড়ি ডুবালিয়া পাড়ায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বী যুবক দীপু চন্দ্র দাসের ওপর। অপরাধ, তিনি ধর্ম নিয়ে, নবীকে নিয়ে কটূক্তি করেছিলেন। তাঁকে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করেই মানুষরূপী পশুরা থামেনি। দীপু চন্দ্রের মরদেহ কারখানার সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকে রেখে আগুন লাগিয়ে দেয়।
গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া এমন নৃশংসতার খবর শুনে প্রথমে কৌতুহলী মন জানতে চেয়েছে, ধর্মকে নিয়ে, নবীকে নিয়ে কী কটুক্তি করেছিলেন দীপু চন্দ্র দাস। এ নিয়ে কয়েকটি পত্রিকার মফস্বল পাতার সম্পাদকের সঙ্গেও কথা বলি, তাঁরাও জানেন না-ধর্ম কিংবা নবীকে নিয়ে ঠিক কী কথা বলেছিলেন দীপু চন্দ্র দাস।
ঢাকার প্রথম সারির এক পত্রিকার ভালুকা প্রতিনিধির সঙ্গে জানাশোনা আমার। মুঠোফোনে তাঁর কাছে জানতে চাই- দীপু চন্দ্রের অপরাধ কী ছিল?
: ধর্মকে নিয়ে কটূক্তি করেছে।
: কী কটূক্তি করেছে আপনি জানেন?
: না, জানি না।
: তাহলে জানে কে? একটু খোঁজ নিয়ে জানাতে পারবেন, ধর্ম কিংবা নবীকে নিয়ে ঠিক কী বলেছিলে দীপু চন্দ্র?
: চেষ্টা করব।
২৭ বছর বয়সী দীপু চন্দ্র দাস জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের কারখানা চাকরি করতেন। তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মোকামিয়াকান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে দীপু চন্দ্র ছিলেন সামান্য শ্রমিক। ওই কারখানায় কাজ করতেন লিংকিং সেকশনে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে কারখানার ভেতরে এক শ্রমিক দীপুর বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের কথা জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজন ও কারখানার কর্মীরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। পরে লোকজন কারখানার ফটক ভাঙার চেষ্টা করলে কারখানার নিরাপত্তাকর্মীরা দিপুকে ফটকের বাইরে ঠেলে দেয়। বিক্ষুদ্ধ জনতার মারধরে দিপু ঘটনাস্থলেই মারা যান।
যদি ধরেই নিই, দীপু চন্দ্র একটা কিছু বলেছিলেন এবং তাঁর বলায় যদি ধর্মের অবমাননা হয়েও থাকে, সেটার জন্য কী তাঁকে পিটিয়ে মারতে হবে, মেরে ফেলার পর আগুন দিতে হবে! এর জন্য আইন আছে, আদালত আছে। যাঁকে পিটিয়ে মারা হলো তাঁর পরিবার আছে। সে পরিবারের কথা একবারও কেউ ভাবল না। ভাববে কী করে, কারখানায় তাঁর সহকর্মী শ্রমিকরাই তো তাঁকে ঠেলে দিয়েছেন মৃত্যুর দিকে!
পিটিয়ে মারার ঘটনায় নিহত দীপু চন্দ্রের ছোট ভাই তপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। এই হত্যার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে জানানো হয়েছে। শুক্রবার অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ময়মনসিংহে এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে নিন্দা জানাই। নতুন বাংলাদেশে এ ধরনের সহিংসতার কোনো স্থান নেই। এই নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।‘
দীপু চন্দ্র দাসের হত্যার বিচার হবে কি হবে না তা সময়ই বলবে। কিন্তু দীপু চন্দ্র দাস আর ফিরবেন না- এটাই অমোঘ সত্য!
ডালাস বার্তা প্রতিবেদক, ঢাকা