জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার: ২০৪০ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার আকাঙ্ক্ষা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর এক হোটেলে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ইশতেহার তুলে ধরেন।

Feb 5, 2026 - 12:19
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার: ২০৪০ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার আকাঙ্ক্ষা
রাজধানীর এক হোটেলে বুধবার জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরছেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর এক হোটেলে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ইশতেহার তুলে ধরেন।

ইশতেহারে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, আইসিটি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর্থিক খাতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে দলটি।

জামায়াত বলেছে, বাংলাদেশকে বিশ্বের ৩৫তম অর্থনীতি থেকে ২০তম অর্থনীতিতে উন্নীত করা হবে, যদিও লক্ষ্য বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। আগামী পাঁচ বছরে আধুনিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এফডিআই ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং আমদানিনির্ভরতা ৩০ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধাপে ধাপে শতাংশে উন্নীত করা, মোট সরকারি ব্যয় জিডিপির ২০ শতাংশে নেওয়া, করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করপোরেট কর হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি হঠাৎ কর্মহীন শ্রমিকদের ভাতা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং ইসলামী ধারার ব্যাংক বিমা খাতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

নারীদের ক্ষেত্রে সম্মান নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কাজের পরিবেশ গড়ে তোলার কথা বলা হলেও, নির্বাচনি সভায় আলোচিত পাঁচ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা বাকি সময়ের মজুরি প্রসঙ্গে ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। তবে মায়েদের সম্মতিতে মাতৃত্বকালীন কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টা করার কথা বলা হয়েছে।

বেকারত্ব দূর করতে দেশে বিদেশে সাত কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবাসে যাওয়ার খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। ইশতেহারের একটি অংশে মুক্তিযুদ্ধ জুলাই বিপ্লবের আদর্শ রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত ইশতেহারে দেশের বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৬টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-

.'জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ' এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন।

. বৈষম্যহীন, ন্যায় ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন।

. যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া।

. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন।

. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।

. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।

. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক স্মার্ট সমাজ গঠন।

. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ।

. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক যাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ব্যবসা বান্ধব টেকসই স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ।

১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।

১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় হওয়া খুন, গুম বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা।

১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা।

১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা।

১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং 'তিন শূন্য ভিশন (পরিবেশগত শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা), বাস্তবায়নের মাধ্যমে 'সবুজ বাংলাদেশ গড়া।

১৫. ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন কর্মসংস্থান তৈরি।

১৬. শ্রমিকদের মজুরি জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা।

১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।

১৯. আধুনিক সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।

২১. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বেধে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা।

২২. যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ চাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা।

২৩. নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা।

২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা।

২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী সমৃদ্ধ কল্যাণ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

তথ্যসূত্র: টিবিএস, বিবিসি বাংলা