পুরোনো সৌন্দর্যের সঙ্গে নতুন গতি, স্পেন কি আবার বিশ্বসেরা হওয়ার পথে?

একসময় স্পেনের ফুটবল মানেই ছিল বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়া। ছোট ছোট পাস, নিখুঁত অবস্থান বদল আর প্রতিপক্ষকে দৌড় করিয়ে ক্লান্ত করে দেওয়ার সেই ফুটবল একসময় পুরো বিশ্বের জন্য ছিল অনুসরণ করার মতো একটি মডেল। ২০০৮ সালে ইউরো, ২০১০ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০১২ সালে আবার ইউরো জিতে স্পেন এমন এক যুগের সূচনা করেছিল, যা আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সফল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

Jul 13, 2026 - 20:59
পুরোনো সৌন্দর্যের সঙ্গে নতুন গতি, স্পেন কি আবার বিশ্বসেরা হওয়ার পথে?
এআই জেনারেটেড

একসময় স্পেনের ফুটবল মানেই ছিল বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়া। ছোট ছোট পাস, নিখুঁত অবস্থান বদল আর প্রতিপক্ষকে দৌড় করিয়ে ক্লান্ত করে দেওয়ার সেই ফুটবল একসময় পুরো বিশ্বের জন্য ছিল অনুসরণ করার মতো একটি মডেল। ২০০৮ সালে ইউরো, ২০১০ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০১২ সালে আবার ইউরো জিতে স্পেন এমন এক যুগের সূচনা করেছিল, যা আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সফল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

সেই দলের প্রাণ ছিলেন জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সের্হিও বুসকেতস, জাবি আলোনসো, ডেভিড ভিয়া ও ইকার কাসিয়াসের মতো কিংবদন্তিরা। তারা শুধু ট্রফিই জেতেননি, ফুটবল খেলার ধারণাটাই বদলে দিয়েছিলেন। ম্যাচে বল বেশির ভাগ সময় স্পেনের পায়েই থাকত, আর প্রতিপক্ষ অনেক সময় বুঝেও উঠতে পারত না কখন, কোথা দিয়ে আক্রমণটা এসে গেল।

কিন্তু ফুটবলে কোনো কৌশলই চিরকাল একইভাবে সফল থাকে না। সময়ের সঙ্গে প্রতিপক্ষও স্পেনের সেই খেলার ধরন বুঝে ফেলতে শুরু করে। নতুন নতুন দল স্পেনকে বলের দখল রাখতে দিলেও নিজেদের রক্ষণ শক্ত করে রাখত এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যেত। অন্যদিকে স্পেনও অনেক বছর ধরে পুরোনো ধাঁচের ফুটবল আঁকড়ে ধরে রাখে। ফলে অনেক ম্যাচে তারা অসংখ্য পাস খেললেও গোলের সামনে সেই ধার বা গতি আর দেখা যেত না। বলের দখল থাকত, কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ সব সময় থাকত না। সেই কারণেই একসময় বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য করা দলটি ধীরে ধীরে নিজেদের আগের অবস্থান হারাতে শুরু করে।

২০১০ সালের পর টানা কয়েকটি বিশ্বকাপে স্পেন প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ২০১৪ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়। ২০১৮ ও ২০২২ সালে শেষ ষোলোতেই থেমে যায় তাদের যাত্রা। বলের দখল ছিল, পাস ছিল, কিন্তু প্রয়োজনের সময় গতি, সরাসরি আক্রমণ এবং গোলের ধার কম ছিল।

২০২৬ বিশ্বকাপে এসে স্পেন আবার সেমিফাইনালে। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এই প্রথম তারা শেষ চারে পৌঁছেছে। তবে বর্তমান স্পেনকে শুধু পুরোনো দলের নতুন সংস্করণ বলা যাবে না। তারা এখনো বল ভালোবাসে, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং ছোট পাসে আক্রমণ গড়ে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে যোগ হয়েছে গতি, মাঠের দুই পাশের ব্যবহার, দ্রুত চাপ এবং প্রয়োজনের সময় সরাসরি গোলের দিকে যাওয়ার সাহস।

এ কারণেই বর্তমান স্পেন শুধু সুন্দর ফুটবল খেলা একটি দল নয়। তারা আবার বিশ্বকাপ জয়ের বাস্তব দাবিদার হয়ে উঠেছে।

বলের দখল এখন আর স্পেনের একমাত্র পরিচয় নয়

স্পেন এখনো ম্যাচে বেশি সময় বল রাখতে চায়। পেদ্রি, রদ্রি, ফাবিয়ান রুইস ও মিকেল মেরিনোর মতো খেলোয়াড়েরা মাঝমাঠে থাকলে বল নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য স্বাভাবিক বিষয়। তারা দ্রুত ছোট পাস খেলতে পারে, প্রতিপক্ষের চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে এবং মাঠের এক পাশ থেকে অন্য পাশে আক্রমণ সরিয়ে নিতে পারে।

তবে বর্তমান দলের বড় পরিবর্তন হলো, তারা শুধু বল রাখার জন্য বল রাখে না। সুযোগ দেখলে দ্রুত সামনে যায়। প্রতিপক্ষের রক্ষণ গুছিয়ে নেওয়ার আগেই আক্রমণ শেষ করার চেষ্টা করে।

লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক। দুই উইঙ্গারই বল পায়ে নিয়ে সরাসরি ডিফেন্ডারের দিকে এগিয়ে যান। তারা শুধু নিরাপদ পাস দিয়ে বল ফেরত দেন না। একের বিপক্ষে একজনকে পরাস্ত করার চেষ্টা করেন, ভেতরে ঢোকেন, ক্রস করেন অথবা নিচু পাসে গোলের সুযোগ তৈরি করেন।

পুরোনো স্পেনের আক্রমণ অনেক সময় মাঠের মাঝখানে আটকে যেত। বর্তমান স্পেন মাঠকে চওড়া করে। দুই উইঙ্গার দুই পাশে অবস্থান নেওয়ায় প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ছড়িয়ে যেতে হয়। তখন মাঝখানে পেদ্রি, মেরিনো বা অন্য কোনো খেলোয়াড়ের জন্য জায়গা তৈরি হয়।

স্পেনের আক্রমণে এখন তাই একাধিক পথ রয়েছে। প্রতিপক্ষ মাঝখান বন্ধ করলে তারা দুই পাশ দিয়ে যায়। দুই পাশে বেশি খেলোয়াড় পাঠালে মাঝখানে জায়গা তৈরি করে। আবার বল হারালে দ্রুত চাপ দিয়ে সেটি ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

এই বহুমাত্রিক খেলাই তাদের আগের কয়েকটি বিশ্বকাপের দলের তুলনায় বেশি বিপজ্জনক করেছে।

সহজ শুরু, কঠিন পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ

২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের নকআউট যাত্রার শুরু ছিল অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। শেষ বত্রিশের সেই ম্যাচে তারা ৩-০ গোলে জয় পায়। মিকেল ওয়ারসাবাল ও পেদ্রো পোরোর গোলের পাশাপাশি পুরো ম্যাচেই স্পেনের নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট ছিল।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয়টি দেখিয়েছিল, নিচে নেমে রক্ষণ করা একটি দলের বিপক্ষেও স্পেন এখন শুধু পাস দিয়ে সময় নষ্ট করে না। তারা বল দ্রুত এক পাশ থেকে অন্য পাশে নেয় এবং বক্সের মধ্যে যথেষ্ট খেলোয়াড় পাঠায়।

তবে আসল পরীক্ষা আসে শেষ ষোলোতে পর্তুগালের বিপক্ষে। দুই দেশের পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পর্তুগালের অভিজ্ঞ খেলোয়াড় এবং নকআউট ম্যাচের চাপ স্পেনকে অনেক বেশি সতর্ক করে দিয়েছিল।

সেই ম্যাচে স্পেন তাদের স্বাভাবিক ছন্দে সব সময় খেলতে পারেনি। পর্তুগাল জায়গা কমিয়ে রেখেছিল এবং পাল্টা আক্রমণে বিপদ তৈরি করেছিল। ম্যাচ দীর্ঘ সময় গোলশূন্য ছিল। অতিরিক্ত সময়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু যোগ করা সময়ে মিকেল মেরিনো গোল করে স্পেনকে ১-০ ব্যবধানের জয় এনে দেন।

এই জয়টি স্পেনের পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। আগের কয়েকটি বিশ্বকাপে ম্যাচ কঠিন হয়ে গেলে তারা অনেক সময় একই পদ্ধতিতে পাস দিয়ে যেত, কিন্তু নতুন কোনো সমাধান খুঁজে পেত না। পর্তুগালের বিপক্ষে তারা শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থেকেছে, আবার প্রয়োজনের সময় বক্সে উপস্থিত হয়ে গোলও করেছে।

কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল। স্পেন এই ম্যাচের আগে টুর্নামেন্টে কোনো গোল খায়নি। অন্যদিকে বেলজিয়াম ছিল বিশ্বকাপের অন্যতম বেশি গোল করা দল। যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে হারিয়ে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল এবং কেভিন ডি ব্রুইনা, জেরেমি ডোকু ও রোমেলু লুকাকুর মতো খেলোয়াড় নিয়ে বড় হুমকি তৈরি করেছিল।

বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেন প্রথমবারের মতো দেখল, প্রতিপক্ষ তাদের রক্ষণকে নিয়মিত চাপের মধ্যে ফেলতে পারে। ম্যাচটি একপেশে ছিল না। স্পেন বলের দখল রাখলেও বেলজিয়াম দ্রুত আক্রমণে সুযোগ তৈরি করেছে এবং গোলও পেয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আবারও মেরিনো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করেন। তার দেরিতে করা গোলেই স্পেন ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়।

পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে মেরিনোর শেষ দিকের গোল দেখিয়েছে, এই স্পেন শুধু শুরুতে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে জানে না। ম্যাচ আটকে গেলে কিংবা শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হলেও তারা সমাধান খুঁজে পেতে পারে।

ইয়ামাল শুধু ভবিষ্যৎ নন, বর্তমানেরও বড় অস্ত্র

লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলে আলোচনা চলছে। অল্প বয়সেই বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে তার পারফরম্যান্স তাকে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ খেলোয়াড়দের একজন বানিয়েছে।

কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি শুধু প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ হিসেবে খেলছেন না। স্পেনের আক্রমণের বড় একটি অংশ তার ওপর নির্ভর করছে।

ডান পাশ থেকে ইয়ামাল বল পেলে প্রতিপক্ষের সামনে কয়েকটি সমস্যা তৈরি হয়। তিনি বাইরে দিয়ে এগিয়ে ক্রস করতে পারেন। ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ে শট নিতে পারেন। আবার দুই ডিফেন্ডার তাকে ঘিরে ধরলে মাঝখানে থাকা সতীর্থকে পাস দিতে পারেন।

তাকে থামাতে প্রায়ই একজনের বেশি খেলোয়াড় প্রয়োজন হয়। এতে স্পেনের অন্য পাশে নিকো উইলিয়ামস অথবা মাঝখানে পেদ্রিদের জন্য জায়গা তৈরি হয়।

তবে ইয়ামালের গুরুত্ব শুধু তার ব্যক্তিগত দক্ষতায় নয়। তিনি স্পেনের নতুন মানসিকতারও প্রতীক। তার খেলায় অতিরিক্ত ভয় বা সতর্কতা দেখা যায় না। বড় ম্যাচেও তিনি ডিফেন্ডারকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং ঝুঁকি নিতে পিছিয়ে যান না।

আগের স্পেন অনেক সময় ভুল এড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অতিরিক্ত নিরাপদ ফুটবল খেলত। ইয়ামাল সেই নিরাপত্তার বাইরে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা করেন। প্রতিটি চেষ্টা সফল হয় না, কিন্তু তার উপস্থিতি প্রতিপক্ষকে সব সময় সতর্ক রাখে।

ফ্রান্সের বিপক্ষে ইয়ামালের কাজ আরও কঠিন হবে। ফ্রান্সের বাঁ পাশের রক্ষণ শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং তাদের উইঙ্গাররাও দ্রুত নিচে নেমে সাহায্য করতে পারেন। ইয়ামালকে হয়তো আগের ম্যাচগুলোর মতো বেশি জায়গা দেওয়া হবে না।

তবু স্পেন যদি ফ্রান্সের রক্ষণকে একদিকে সরিয়ে তাকে একের বিপক্ষে একজনের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে, তাহলে ম্যাচে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন তিনি।

নিকো উইলিয়ামসের গতি স্পেনকে বদলে দিয়েছে

স্পেনের পুরোনো দলগুলো অনেক সময় মাঠের দুই পাশকে যথেষ্ট ব্যবহার করত না। উইঙ্গাররা ভেতরে ঢুকে যাওয়ায় আক্রমণ মাঝখানে ভিড়ের মধ্যে আটকে পড়ত।

নিকো উইলিয়ামস সেই সমস্যার একটি বড় সমাধান। বাঁ পাশে তিনি মাঠকে চওড়া রাখেন এবং বল পেলে সরাসরি সামনে এগিয়ে যান। তার গতি প্রতিপক্ষের ডান পাশের ডিফেন্ডারকে পেছনে থাকতে বাধ্য করে।

ইয়ামাল ও নিকো দুই পাশে থাকলে প্রতিপক্ষ একই সঙ্গে দুজনকে আটকাতে সমস্যায় পড়ে। এক পাশে বাড়তি খেলোয়াড় পাঠালে অন্য পাশে স্পেন দ্রুত বল সরিয়ে নিতে পারে।

এই দুই উইঙ্গারের কারণে স্পেনের মাঝমাঠও বেশি কার্যকর হয়েছে। পেদ্রি বা মেরিনো বল নিয়ে সামনে উঠলে তাদের সামনে শুধু মাঝখানের সরু পথ খোলা থাকে না। দুই পাশে পাস দেওয়ার সুযোগও থাকে।

তবে নিকোর সিদ্ধান্ত সব সময় নিখুঁত নয়। কখন পাস দিতে হবে, কখন শট নিতে হবে এবং কখন আক্রমণের গতি কমাতে হবে, এসব জায়গায় তার আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

ফ্রান্সের বিপক্ষে অতিরিক্ত তাড়াহুড়া করলে স্পেনের জন্য বিপদ হতে পারে। কারণ বল হারানোর পর ফ্রান্স দ্রুত পাল্টা আক্রমণ করে। তাই নিকোকে সাহসী হওয়ার পাশাপাশি সঠিক সিদ্ধান্তও নিতে হবে।

মাঝমাঠে পেদ্রি ও রদ্রির ভারসাম্য

স্পেনের পুরো খেলার কেন্দ্র মাঝমাঠ। ইয়ামাল ও নিকো আক্রমণে গতি এনে দিলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করে পেদ্রি, রদ্রি, ফাবিয়ান রুইস ও মেরিনোর ওপর।

পেদ্রি বল পায়ে নিয়ে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিনি সব সময় গোল বা সহায়তার পরিসংখ্যানে সামনে থাকেন না, কিন্তু আক্রমণের গতি ঠিক করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বড়। কখন এক ছোঁয়ায় পাস দিতে হবে, কখন বল ধরে রাখতে হবে এবং কখন প্রতিপক্ষের মাঝমাঠের পেছনে ঢুকতে হবে, তিনি তা ভালো বোঝেন।

রদ্রি স্পেনের খেলার ভারসাম্য রক্ষা করেন। তিনি রক্ষণ থেকে বল নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন, প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ থামান এবং স্পেনের অন্য খেলোয়াড়দের সামনে যাওয়ার নিরাপত্তা দেন।

দীর্ঘ চোটের পর রদ্রির ফিরে আসা স্পেনের জন্য বড় ঘটনা। তবে তাকে ঘিরে সতর্কতাও রয়েছে। তিনি আগের মতো টানা উচ্চ গতির ম্যাচ খেলার অবস্থায় আছেন কি না, সেটি এখনো পরীক্ষা হচ্ছে। ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঝমাঠে তাকে অনেক জায়গা সামলাতে হবে।

স্পেন যদি বেশি খেলোয়াড় নিয়ে সামনে যায় এবং বল হারায়, তাহলে এমবাপ্পে, দেম্বেলে বা ওলিসে দ্রুত সেই ফাঁকা জায়গা কাজে লাগাতে পারেন। রদ্রিকে তাই শুধু বল পাস করলেই হবে না। তাকে আগে থেকেই বুঝতে হবে, স্পেনের আক্রমণ ভেঙে গেলে কোথায় দাঁড়াতে হবে।

মেরিনো এই মাঝমাঠে অন্য ধরনের শক্তি যোগ করেন। তিনি পেদ্রির মতো শুধু পাসে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন না। শারীরিক লড়াই করেন, বক্সে ঢোকেন এবং মাথা বা পায়ে গোল করতে পারেন।

পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে তার দেরিতে করা গোলগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা যখন স্পেনের ফরোয়ার্ড ও উইঙ্গারদের দিকে মনোযোগ দেয়, তখন মেরিনো পেছন থেকে বক্সে ঢুকে পড়েন। তাকে অনুসরণ করা কঠিন হয়ে যায়।

এই কারণে স্পেনের আক্রমণে এখন গোলের দায়িত্ব শুধু একজন ফরোয়ার্ডের ওপর নেই।

একজন বড় গোলদাতার অভাব কি সমস্যা?

স্পেনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি তাদের মূল স্ট্রাইকারকে ঘিরে। দলের কাছে অনেক দক্ষ আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় থাকলেও এমবাপ্পে, হ্যারি কেইন বা লাউতারো মার্তিনেজের মতো নিয়মিত বড় গোল করা একজন কেন্দ্রীয় ফরোয়ার্ড নেই।

মিকেল ওয়ারসাবাল, আলভারো মোরাতা এবং অন্য বিকল্পরা দলের জন্য কাজ করেন। তারা জায়গা তৈরি করেন, চাপ প্রয়োগ করেন এবং অন্যদের খেলায় যুক্ত করেন। কিন্তু প্রতিটি বড় ম্যাচে একটি সুযোগ পেয়ে গোল করে দেওয়ার নিশ্চয়তা সব সময় দিতে পারেন না।

এ কারণেই স্পেনকে অনেক সময় গোলের জন্য উইঙ্গার ও মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভর করতে হয়। মেরিনোর গুরুত্বপূর্ণ গোলগুলো তাদের বাঁচিয়েছে। কিন্তু সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে সুযোগ কম আসতে পারে।

স্পেন যদি দীর্ঘ সময় বলের দখল রেখেও পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে না পারে, তাহলে পুরোনো সমস্যাটি আবার দেখা দিতে পারে। বল থাকবে, পাস থাকবে, কিন্তু গোল থাকবে না।

ফ্রান্সের মতো দল এমন পরিস্থিতিতে অপেক্ষা করতে পারে। তারা জানে, একটি ভুল পাস বা একটি ব্যর্থ আক্রমণের পর এমবাপ্পেদের সামনে জায়গা তৈরি হবে।

তাই স্পেনকে বলের দখলকে গোলের সুযোগে রূপান্তর করতে হবে। শুধু সুন্দর আক্রমণ যথেষ্ট হবে না। শেষ পাস ও শটে আরও কার্যকর হতে হবে।

রক্ষণে উন্নতি, কিন্তু বড় পরীক্ষা এখনো বাকি

এই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে পর্যন্ত স্পেন কোনো গোল খায়নি। অস্ট্রিয়া ও পর্তুগালের বিপক্ষে তাদের রক্ষণ খুব সংগঠিত ছিল। পাউ কুবারসি, রবিন লে নরমাঁ, মার্ক কুকুরেয়া ও পেদ্রো পোরো প্রতিপক্ষকে খুব বেশি পরিষ্কার সুযোগ দেয়নি।

স্পেনের রক্ষণের বড় শক্তি হলো, তারা শুধু নিজেদের বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে রক্ষণ করে না। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে সামনে চাপ প্রয়োগ করে। এতে প্রতিপক্ষ পাল্টা আক্রমণ শুরু করার আগেই বল ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এই কৌশলে ঝুঁকিও আছে। প্রথম চাপ ভেঙে গেলে রক্ষণরেখার পেছনে অনেক জায়গা থাকে। দ্রুতগতির ফরোয়ার্ডদের বিপক্ষে এটি বিপজ্জনক।

বেলজিয়াম সেই দুর্বলতার কিছুটা দেখিয়েছে। ডোকুর গতি এবং ডি ব্রুইনার পাস স্পেনের রক্ষণকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছে, যা আগের ম্যাচগুলোতে দেখা যায়নি। স্পেন গোলও হজম করেছে।

ফ্রান্সের আক্রমণ বেলজিয়ামের চেয়েও দ্রুত ও বহুমাত্রিক। এমবাপ্পে শুধু বাঁ পাশ দিয়ে দৌড়ান না। তিনি মাঝখানে ঢোকেন, অন্যদের সঙ্গে জায়গা বদল করেন এবং প্রতিপক্ষের পেছনে ছুটে যান। দেম্বেলে দুই পাশেই খেলতে পারেন। ওলিসে মাঝখানে নেমে আক্রমণ তৈরি করেন।

স্পেনের ডিফেন্ডাররা যদি খুব ওপরে উঠে যান, তাহলে তাদের পেছনের জায়গা ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেন কীভাবে খেলতে পারে?

সেমিফাইনালে স্পেনের প্রথম লক্ষ্য হবে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা। ফ্রান্স যেন বারবার খোলা মাঠে দৌড়ানোর সুযোগ না পায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

স্পেন বলের দখল রাখবে, কিন্তু প্রতিটি আক্রমণে সবাইকে সামনে পাঠানো যাবে না। অন্তত দুই ডিফেন্ডারের সঙ্গে রদ্রি বা অন্য একজন মাঝমাঠের খেলোয়াড়কে পেছনে প্রস্তুত থাকতে হবে।

এমবাপ্পেকে একজন ডিফেন্ডারের দায়িত্বে ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক। তবে তিনজন খেলোয়াড়কে শুধু তার পেছনে পাঠালে অন্য পাশে দেম্বেলে ও ওলিসের জন্য জায়গা তৈরি হবে। তাই স্পেনকে ব্যক্তিগত পাহারার বদলে সম্মিলিতভাবে জায়গা বন্ধ করতে হবে।

অন্যদিকে ফ্রান্সের রক্ষণকে ভাঙতে স্পেনকে দ্রুত দুই পাশ বদলাতে হবে। ফ্রান্স যদি ইয়ামালের দিকে বাড়তি খেলোয়াড় পাঠায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে নিকোর পাশে বল পাঠাতে হবে। আবার দুই উইঙ্গারকে আটকে রাখতে ফ্রান্সের রক্ষণ ছড়িয়ে গেলে মেরিনো ও পেদ্রিকে মাঝখানে ঢুকতে হবে।

স্পেনের আরেকটি সুযোগ হতে পারে ফ্রান্সকে দীর্ঘ সময় বল ছাড়া রাখা। এমবাপ্পে ও দেম্বেলে যদি নিচে নেমে রক্ষণ করতে বাধ্য হন, তাহলে পাল্টা আক্রমণে তাদের শুরুর অবস্থান গোলপোস্ট থেকে অনেক দূরে থাকবে।

তবে শুধু বল ধরে রেখে ফ্রান্সকে থামানো যাবে না। দ্রুত আক্রমণ শেষ করতে হবে এবং ভুল জায়গায় বল হারানো এড়াতে হবে।

দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে বড় সাফল্য

লুইস দে লা ফুয়েন্তে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাকে ঘিরে বড় ধরনের উত্তেজনা ছিল না। তিনি ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত কোচদের একজন ছিলেন না। তবে স্পেনের বয়সভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে বর্তমান প্রজন্মের অনেক খেলোয়াড়কে তিনি আগে থেকেই চিনতেন।

এই পরিচিতি তার বড় শক্তি হয়েছে। তিনি তরুণদের শুধু সুযোগ দেননি, তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দিয়েছেন। ইয়ামাল বা কুবারসিকে বয়সের কারণে আড়ালে রাখেননি। আবার রদ্রি, মেরিনো ও ওয়ারসাবালের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাদের ভারসাম্য তৈরি করেছেন।

তার অধীনে স্পেন পুরোনো ফুটবল পরিচয় পুরোপুরি বাতিল করেনি। বলের দখল, ছোট পাস এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের মূল শক্তি। কিন্তু তিনি সেই পরিচয়ের সঙ্গে গতি ও সরাসরি আক্রমণ যোগ করেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান স্পেন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্যে আটকে নেই। ম্যাচের ধরন অনুযায়ী তারা পরিবর্তন করতে পারে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আধিপত্য করেছে, পর্তুগালের বিপক্ষে ধৈর্য ধরেছে এবং বেলজিয়ামের বিপক্ষে লড়াই করে শেষ মুহূর্তে জিতেছে।

একটি বিশ্বকাপ জিততে এই নমনীয়তা প্রয়োজন।

স্পেন কি আবার বিশ্বসেরা হওয়ার পথে?

স্পেনের সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন বাধা। ফ্রান্স শুধু এই বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দল নয়, গত তিন বিশ্বকাপেই তারা সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা, স্কোয়াডের গভীরতা এবং আক্রমণের গতি তাদের এগিয়ে রাখে।

তবে স্পেনেরও এমন কিছু শক্তি আছে, যা ফ্রান্সকে সমস্যায় ফেলতে পারে। তারা দীর্ঘ সময় বল ধরে রাখতে পারে। মাঝমাঠে সংখ্যার সুবিধা তৈরি করতে পারে। দুই পাশে ইয়ামাল ও নিকোর গতি রয়েছে। মেরিনোর মতো একজন খেলোয়াড় আছেন, যিনি ম্যাচের শেষ মুহূর্তেও গোলের জায়গায় পৌঁছে যান।

স্পেনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, তারা আবার নিজেদের ফুটবলে বিশ্বাস করতে শিখেছে। তবে সেই বিশ্বাস এখন আর অতীতের অনুকরণে দাঁড়িয়ে নেই। তারা ২০১০ সালের দলকে নকল করার চেষ্টা করছে না। বরং নিজেদের পুরোনো শক্তিকে নতুন প্রজন্মের গতি ও সাহসের সঙ্গে মিলিয়েছে।

এই দলটি সুন্দর ফুটবল খেলতে পারে, আবার প্রয়োজন হলে কষ্ট করেও জিততে পারে। ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আবার শেষ মুহূর্তেও গোল খুঁজে পায়। তরুণদের ভয়হীনতা এবং অভিজ্ঞদের স্থিরতা একসঙ্গে কাজ করছে।

তবে বিশ্বসেরা হওয়ার জন্য এখনো দুটি কঠিন ধাপ বাকি। প্রথমটি ফ্রান্স। সেই বাধা পার হতে হলে স্পেনকে হয়তো এই বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা ম্যাচটি খেলতে হবে।

সৌন্দর্য তাদের পরিচয়। গতি তাদের নতুন শক্তি। কিন্তু শিরোপা জিততে প্রয়োজন হবে আরও একটি বিষয়, বড় মুহূর্তে নিখুঁত সিদ্ধান্ত।

স্পেন যদি সেটি করতে পারে, তাহলে ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে লাল-হলুদ পতাকা সবচেয়ে ওপরে উড়তে পারে।

সূত্র: ফিফা, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা ও ফিফা ট্রেনিং সেন্টার