প্রতিভা আছে, ইতিহাসের চাপও আছে: ইংল্যান্ড কি এবার পারবে?
সেমিফাইনালে তাদের সামনে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তাই প্রশ্নটা এখন আরও বড় হয়ে উঠেছে। ইংল্যান্ড কি আবারও ভালো খেলেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরবে, নাকি এবার সত্যিই ৬০ বছরের অপেক্ষা শেষ করার পথে আরও এক ধাপ এগোবে?
ইংল্যান্ডের ফুটবলে প্রতিভার অভাব কখনোই ছিল না। প্রায় প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের আগে তাদের দল নিয়ে নতুন করে আশা তৈরি হয়। প্রিমিয়ার লিগের তারকা, ইউরোপের বড় ক্লাবে খেলা ফুটবলার আর পরিচিত নামের ভিড় দেখে সমর্থকেরা ভাবেন, এবার হয়তো অপেক্ষার শেষ হবে।
কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই ইংল্যান্ডকে শুধু মাঠের প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়তে হয় না। তাদের সঙ্গে থাকে ১৯৬৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ জিততে না পারার দীর্ঘ ইতিহাস, আগের ব্যর্থতার স্মৃতি, সংবাদমাধ্যমের চাপ এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আবারও সবকিছু হারানোর ভয়।
২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই পুরোনো প্রশ্ন ফিরে এসেছে। হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা, ডেকলান রাইস, ফিল ফোডেন ও কোল পামারের মতো খেলোয়াড় থাকায় এই দলের প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইংল্যান্ড সেমিফাইনালেও পৌঁছে গেছে। কিন্তু ভালো খেলোয়াড়ে ভরা দল আর বিশ্বকাপজয়ী দল এক জিনিস নয়।
সেমিফাইনালে তাদের সামনে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তাই প্রশ্নটা এখন আরও বড় হয়ে উঠেছে। ইংল্যান্ড কি আবারও ভালো খেলেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরবে, নাকি এবার সত্যিই ৬০ বছরের অপেক্ষা শেষ করার পথে আরও এক ধাপ এগোবে?
ভালো ফুটবলের চেয়ে বেশি দরকার ফল
ইংল্যান্ডের ২০২৬ বিশ্বকাপ যাত্রা সব সময় সহজ বা নিখুঁত ছিল না। গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়া, ঘানা ও পানামার বিপক্ষে তাদের কখনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে, কখনো নিচে নেমে থাকা রক্ষণ ভাঙতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। নকআউট পর্বেও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে তারা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে শুধু সুন্দর ফুটবল খেলে জয় পাওয়া সম্ভব ছিল না।
শেষ বত্রিশে কঙ্গোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ইংল্যান্ড ২-১ গোলে জিতেছে। বিশ্বকাপে পিছিয়ে পড়ার পর জয় পাওয়াটা ইংল্যান্ডের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বিরল ঘটনা ছিল। এর আগে ১৯৬৬ সালের ফাইনালের পর তারা বিশ্বকাপে আর কোনো ম্যাচে প্রথমে গোল খেয়ে জয় পায়নি।
শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিপক্ষেও তাদের পথ সহজ ছিল না। ৩-২ গোলের জয়ে ইংল্যান্ডকে আবারও দেখাতে হয়েছে, চাপের মধ্যে তারা ম্যাচে ফিরে আসতে পারে। জুড বেলিংহামের দুই গোল সেই ম্যাচে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে একই গল্প আরেকবার দেখা গেছে। প্রথমার্ধে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। দলটির আক্রমণ খুব বেশি ছন্দময় ছিল না। হ্যারি কেইন নিজের স্বাভাবিক মানে খেলতে পারেননি। মাঝমাঠেও ইংল্যান্ড দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়।
তবু প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বেলিংহাম সমতা ফেরান। অতিরিক্ত সময়ের তৃতীয় মিনিটে তিনিই আবার গোল করে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানের জয় এনে দেন।
একটি টুর্নামেন্ট জিততে প্রতিটি ম্যাচে সেরা ফুটবল খেলা জরুরি নয়। বরং যেদিন দল ভালো খেলতে পারে না, সেদিনও কোনোভাবে জিততে পারাই বড় দলের বৈশিষ্ট্য। ইংল্যান্ড এই বিশ্বকাপে অন্তত সেই ক্ষমতা দেখিয়েছে।
তবে এর আরেকটি দিকও আছে। বারবার পিছিয়ে পড়া, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং শেষ মুহূর্তের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক। কঙ্গো, মেক্সিকো বা নরওয়ের বিপক্ষে যে ভুলের পরও ফিরে আসা সম্ভব হয়েছে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একই সুযোগ নাও আসতে পারে।
বেলিংহাম কি ইংল্যান্ডের মানসিকতার পরিবর্তন?
২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন জুড বেলিংহাম। তিনি শুধু গোল করছেন না, ম্যাচের সবচেয়ে চাপের মুহূর্তে সামনে এগিয়ে আসছেন।
নরওয়ের বিপক্ষে ইংল্যান্ড যখন ধীর, অস্থির ও কিছুটা দিশাহীন, তখন বেলিংহামই প্রথম গোলটি করেন। অতিরিক্ত সময়েও সুযোগটি সবচেয়ে দ্রুত বুঝে তিনিই জয়সূচক গোল করেন।
এই বিশ্বকাপে বেলিংহাম ছয়টি গোল করেছেন। সবগুলোই পেনাল্টি ছাড়া। ইংল্যান্ডের হয়ে একটি বড় টুর্নামেন্টে পেনাল্টি ছাড়া এত গোল করার রেকর্ডে তিনি ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ছয় গোল করা গ্যারি লিনেকারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে পরপর দুই নকআউট ম্যাচে তিনি অন্তত দুটি করে গোল করেছেন। বিশ্বকাপের একই আসরে পরপর দুই নকআউট ম্যাচে এমন কীর্তি সর্বশেষ করেছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা, ১৯৮৬ সালে।
তবে বেলিংহামের গুরুত্ব শুধু এই পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ইংল্যান্ডের আগের অনেক দল চাপের মুহূর্তে সতর্ক হয়ে যেত। খেলোয়াড়েরা ভুল না করার চেষ্টা করতে গিয়ে স্বাভাবিক খেলাই হারিয়ে ফেলতেন। বেলিংহামের মধ্যে সেই ভয় খুব কম দেখা যায়।
তিনি বল চান, প্রতিপক্ষের বক্সে ঢোকেন, ডিফেন্ডারকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং ম্যাচের দায়িত্ব নিতে পিছিয়ে যান না। তার শরীরী ভাষাতেও আত্মবিশ্বাস দেখা যায়। কোনো সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে তিনি প্রতিক্রিয়া জানান, সতীর্থদের তাগিদ দেন এবং দল পিছিয়ে পড়লেও নিজেকে আড়াল করেন না।
এই মনোভাব কখনো কখনো তার জন্য সমস্যাও তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত আবেগ, রেফারির সঙ্গে তর্ক বা কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে দৃশ্যমান অসন্তুষ্টি বড় ম্যাচে ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু একই আবেগ ইংল্যান্ডকে এমন একজন নেতা দিয়েছে, যিনি ম্যাচ কঠিন হয়ে গেলে আরও বেশি সক্রিয় হন।
৬০ বছরের ব্যর্থতার ইতিহাস বহন করা একটি দলের জন্য এমন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন আছে। কারণ ইতিহাসের চাপ থেকে মুক্ত হতে শুধু দক্ষতা নয়, সাহসও দরকার।
কেইনের শেষ বড় সুযোগগুলোর একটি
বেলিংহামের উত্থানে হ্যারি কেইনের গুরুত্ব কমে যায়নি। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক এখনো দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলদাতা এবং আক্রমণের প্রধান কেন্দ্র।
এই বিশ্বকাপে কেইন পাঁচটি গোল করেছেন। বেলিংহাম ও কেইন দুজনই অন্তত পাঁচটি করে গোল করেছেন। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে কোনো বিশ্বকাপ বা ইউরোতে এর আগে একই দলের দুই খেলোয়াড় পাঁচ বা তার বেশি গোল করতে পারেননি।
কেইনের খেলার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু বক্সের মধ্যে গোল করা নয়। তিনি নিচে নেমে বল নিতে পারেন, মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে পারেন এবং পেছন থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের জন্য জায়গা তৈরি করেন।
কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে কেইনের পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, ইংল্যান্ডের আক্রমণ এখনো তার ছন্দের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। তিনি ভালো না খেললে দলটির সামনে বল ধরে রাখা এবং নিয়মিত সুযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কেইনকে শুধু গোলের জন্য অপেক্ষা করলে হবে না। তাকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও আর্জেন্টিনার অন্য ডিফেন্ডারদের টেনে জায়গা তৈরি করতে হবে। সেই জায়গায় বেলিংহাম, সাকা বা পামার ঢুকতে পারলে ইংল্যান্ডের আক্রমণ আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
কেইনের জন্য ব্যক্তিগতভাবেও এই বিশ্বকাপের গুরুত্ব অনেক। ক্লাব পর্যায়ে অসংখ্য গোল করলেও বড় শিরোপার সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘদিন জটিল ছিল। জাতীয় দলের হয়ে তিনি ইউরোর ফাইনাল খেলেছেন, বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছেন, কিন্তু এখনো বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতেননি।
ইংল্যান্ডের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং কেইনের ব্যক্তিগত অপূর্ণতা তাই একই জায়গায় এসে মিলেছে।
টুখেলের ইংল্যান্ড কীভাবে আলাদা?
গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে ইংল্যান্ড টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকভাবে শেষের দিকে পৌঁছাতে শিখেছিল। ২০১৮ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল, ২০২১ ও ২০২৪ ইউরোর ফাইনাল এবং ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ইংল্যান্ডকে আবারও বড় টুর্নামেন্টের নিয়মিত প্রতিযোগীতে পরিণত করে।
তবে সাউথগেটের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তিনি অনেক সময় অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যেতেন। ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর আক্রমণ ধরে রাখার বদলে নিচে নেমে ফল রক্ষা করার চেষ্টা করত। এতে প্রতিপক্ষ ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগ পেত।
টমাস টুখেল দায়িত্ব নেওয়ার পর ইংল্যান্ডকে কিছুটা বেশি সরাসরি এবং আক্রমণাত্মক করার চেষ্টা করেছেন। তার দল শুধু মাঝমাঠ দিয়ে ছোট পাসে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করে না। তারা মাঠের দুই পাশ ব্যবহার করে, নিয়মিত ক্রস করে এবং প্রতিপক্ষের বক্সে একাধিক খেলোয়াড় পাঠায়।
কঙ্গোর বিপক্ষে ইংল্যান্ড খোলা খেলা থেকে ৩৫টি ক্রস করেছিল। বিশ্বকাপে ১৯৬৬ সালের পর একটি ম্যাচে এত বেশি ক্রস তারা আর করেনি। এ থেকে বোঝা যায়, নিচে নেমে রক্ষণ করা দলের বিপক্ষে টুখেল মাঠের দুই পাশ ব্যবহার করে সমাধান খুঁজতে চেয়েছেন।
এই কৌশলের সুবিধা হলো, ইংল্যান্ডের কাছে কেইনের মতো একজন ফরোয়ার্ড আছেন। বেলিংহামও পেছন থেকে বক্সে ঢুকে হেড বা দ্বিতীয় বল থেকে সুযোগ তৈরি করতে পারেন। সাকা, গর্ডন, মাদুয়েকে ও অন্য উইঙ্গাররা দুই পাশ থেকে বল দিতে পারেন।
তবে অতিরিক্ত ক্রস সব সময় কার্যকর নয়। প্রতিপক্ষ যদি বক্সের মধ্যে সংখ্যায় বেশি থাকে, তাহলে একের পর এক উঁচু বল সহজেই পরিষ্কার করা যায়। আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডাররা শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং বক্সের মধ্যে অবস্থান ধরে রাখতে অভ্যস্ত। তাই শুধু ক্রসের ওপর নির্ভর করলে ইংল্যান্ডের আক্রমণ অনুমান করা সহজ হয়ে যাবে।
টুখেলকে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আরও ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনা নিতে হবে। মাঠের দুই পাশ ব্যবহারের পাশাপাশি মাঝ দিয়ে দ্রুত পাস, বেলিংহামের দৌড় এবং সাকার একের বিপক্ষে একজনকে পরাস্ত করার ক্ষমতাও কাজে লাগাতে হবে।
ইংল্যান্ড কি এখন চাপ সামলাতে জানে?
২০১৮ সালের পর ইংল্যান্ড চারটি বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। ২০১৮ সালের আগে পুরো ইতিহাসে তারা যতবার বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে উঠেছিল, গত আট বছরেই প্রায় সমানসংখ্যকবার সেখানে পৌঁছেছে।
এটি বড় পরিবর্তন। আগের ইংল্যান্ড দলগুলো নকআউট পর্বে গেলেই যেন আলাদা এক চাপ অনুভব করত। পেনাল্টি শুটআউট, গুরুত্বপূর্ণ ভুল এবং অতিরিক্ত সতর্ক ফুটবল তাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে গিয়েছিল।
বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা বড় ম্যাচে বেশি অভ্যস্ত। কেইন, বেলিংহাম, রাইস, সাকা ও ফোডেন নিয়মিত চ্যাম্পিয়নস লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলেন। তারা ক্লাব পর্যায়ে শিরোপার লড়াই এবং প্রবল প্রত্যাশার মধ্যে থাকেন।
এই অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডকে আগের তুলনায় শক্তিশালী করেছে। পিছিয়ে পড়ার পরও তারা এখন ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করে না। কঙ্গো, মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে ফিরে আসা সেই মানসিক পরিবর্তনের প্রমাণ।
তবে চাপ সামলাতে পারা আর চাপের মধ্যে সেরা সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। ইংল্যান্ড এখনো ম্যাচের কিছু সময়ে অস্থির হয়ে পড়ে। বলের গতি কমে যায়, খেলোয়াড়েরা নিরাপদ পাসে বেশি মনোযোগ দেন এবং আক্রমণ কয়েকজনের ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এমন সময় এলে ইংল্যান্ডকে শান্ত থাকতে হবে। বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা জানে কীভাবে ম্যাচের গতি কমাতে হয়, ছোট বিরতি তৈরি করতে হয় এবং প্রতিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করতে হয়। তারা শুধু ভালো ফুটবল খেলে না, টুর্নামেন্টের কঠিন মুহূর্তও খুব ভালোভাবে বোঝে।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইতিহাসের আরেক অধ্যায়
ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই শুধু একটি সাধারণ সেমিফাইনাল নয়। দুই দলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে বহু আলোচিত ঘটনা রয়েছে।
১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল এমন এক ম্যাচে, যেখানে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া নিয়ে বড় বিতর্ক হয়েছিল। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং কয়েক মিনিট পর তার অসাধারণ একক গোল এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বিশ্ব ফুটবলের স্থায়ী গল্পে পরিণত করে।
১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড এবং টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের বিদায় আরেকটি বেদনাদায়ক স্মৃতি। ২০০২ সালে বেকহামের পেনাল্টি থেকে ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে কিছুটা প্রতিশোধ নিয়েছিল।
এবারের ম্যাচে অতীতের সেই ঘটনা সরাসরি ফল নির্ধারণ করবে না। বর্তমান খেলোয়াড়দের অনেকেই সেই ম্যাচগুলোর সময় জন্মও নেননি। তবু সমর্থক, সংবাদমাধ্যম এবং দুই দেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে ইতিহাসের উপস্থিতি থাকবে।
ইংল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হবে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত আবেগের লড়াই বানিয়ে ফেলা। আর্জেন্টিনা শারীরিক সংঘর্ষ, সময় নষ্ট করা, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে চাপ তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষের আবেগকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ।
বেলিংহাম, রাইস ও রোমেরোর মতো আবেগপ্রবণ খেলোয়াড়দের উপস্থিতিতে ম্যাচ উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। ইংল্যান্ডকে তাই আক্রমণাত্মক হতে হবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারানো যাবে না।
মেসিকে থামালেই কি আর্জেন্টিনা থামবে?
ইংল্যান্ডের পরিকল্পনার বড় অংশ অবশ্যই লিওনেল মেসিকে ঘিরে থাকবে। বয়স বাড়লেও তিনি এখনো এমন জায়গায় বল গ্রহণ করেন, যেখান থেকে একটি পাসেই পুরো রক্ষণ ভেঙে দিতে পারেন।
তবে শুধু মেসিকে ঘিরে তিনজন খেলোয়াড় রাখলে ইংল্যান্ড অন্য জায়গায় ফাঁকা তৈরি করবে। হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো খেলোয়াড়েরা সেই জায়গা কাজে লাগাতে পারেন।
মেসিকে থামানোর সবচেয়ে ভালো উপায় সব সময় সরাসরি তাকে ট্যাকল করা নয়। বরং তিনি যেন বিপজ্জনক জায়গায় সহজে বল না পান, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ইংল্যান্ডের মাঝমাঠকে আর্জেন্টিনার পাসের পথ বন্ধ করতে হবে এবং বল হারানোর পর দ্রুত নিজেদের অবস্থানে ফিরতে হবে।
রাইসের শারীরিক অবস্থা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নরওয়ের বিপক্ষে অসুস্থতা ও শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি প্রথমার্ধের পর উঠে গিয়েছিলেন। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তিনি পুরোপুরি সুস্থ না থাকলে ইংল্যান্ডের মাঝমাঠে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
মেসির সামনে জায়গা বন্ধ করতে রাইসের বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং দ্রুত অবস্থান নেওয়া খুব প্রয়োজন। পাশাপাশি বেলিংহামকে কতটা আক্রমণে রাখা হবে এবং কতটা নিচে নেমে সাহায্য করতে হবে, সেটিও টুখেলের বড় সিদ্ধান্ত হবে।
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি ও সবচেয়ে বড় দুর্বলতা
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের বিকল্প। কোনো একটি কৌশল কাজ না করলে বেঞ্চ থেকে সাকা, পামার, গর্ডন, রজার্স, এজে বা স্পেন্সের মতো খেলোয়াড় এনে ম্যাচ বদলানোর সুযোগ আছে।
নরওয়ের বিপক্ষে বিরতির সময় পরিবর্তন করার পর ইংল্যান্ডের খেলার গতি কিছুটা বেড়েছিল। অতিরিক্ত সময়েও বেঞ্চ থেকে আসা খেলোয়াড়েরা আক্রমণে ভূমিকা রেখেছেন। একটি দীর্ঘ টুর্নামেন্টে এই গভীরতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও স্পষ্ট। দলটি এখনো কেইন ও বেলিংহামের গোলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের প্রায় সব গোলই এই দুই খেলোয়াড়ের কাছ থেকে এসেছে।
আর্জেন্টিনা যদি দুজনকে কার্যকরভাবে আটকে রাখতে পারে, তাহলে অন্যদের সামনে এগিয়ে আসতে হবে। সাকা, ফোডেন, পামার বা অন্য কোনো আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কে গোল বা চূড়ান্ত পাসের দায়িত্ব নিতে হবে।
আরেকটি সমস্যা হলো ম্যাচের মধ্যে ইংল্যান্ডের মান অনেকটা ওঠানামা করে। কিছু সময় তারা দ্রুত, আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক। আবার কিছু সময় বলের গতি কমে যায় এবং তারা প্রতিপক্ষকে ফিরে আসার সুযোগ দেয়।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এই ওঠানামা বড় মূল্য দাবি করতে পারে।
তাহলে ইংল্যান্ড কি এবার পারবে?
ইংল্যান্ডের কাছে বিশ্বকাপ জেতার মতো প্রতিভা আছে। তাদের একজন অভিজ্ঞ ও কৌশলী কোচ আছেন। কেইনের মতো গোলদাতা, বেলিংহামের মতো বড় মুহূর্তের খেলোয়াড় এবং ম্যাচ বদলে দেওয়ার মতো শক্তিশালী বেঞ্চও আছে।
তারা এই বিশ্বকাপে বারবার পিছিয়ে পড়েও ফিরে এসেছে। চাপের মুহূর্তে ভেঙে না পড়ে লড়াই করেছে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায়ও বোঝা যায়, ইংল্যান্ড এখন আর শুধু নামের ভারে বড় দল নয়। তারা নিয়মিতভাবে বড় টুর্নামেন্টের শেষ পর্যায়ে পৌঁছাতে জানে।
তবু এখনো একটি প্রশ্নের উত্তর বাকি। তারা কি শুধু শেষ চারে পৌঁছাতে জানে, নাকি শেষ দুই ধাপও পার হতে পারে?
আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের টুর্নামেন্ট জেতার অভিজ্ঞতা আছে। তাদের দলে মেসি আছেন, তবে দলটি শুধু মেসির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তারা ম্যাচের আবেগ, সময় এবং ছোট ছোট মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করতে জানে।
ইংল্যান্ডকে তাই শুধু প্রতিভা দেখালে হবে না। তাদের পরিণত, ধৈর্যশীল এবং কৌশলগতভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে। সুযোগ এলে কাজে লাগাতে হবে, আবার উত্তেজনার মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।
১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ডের প্রতিটি প্রজন্মই কোনো না কোনোভাবে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিভা ছিল, আশা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু একটা কম পড়ে গেছে।
২০২৬ সালের দলটির সামনে সেই ইতিহাস বদলানোর সুযোগ এসেছে। এবার তাদের হাতে শুধু সম্ভাবনা নেই, প্রমাণ করার মতো একটি মঞ্চও আছে।
ইংল্যান্ড যদি আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারে, তাহলে তারা ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠবে। আর তখন দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত সেই কথাটি আর শুধু সমর্থকদের গান হয়ে থাকবে না।
বিশ্বকাপ সত্যিই আবার ইংল্যান্ডের নাগালের মধ্যে চলে আসবে।
সূত্র: ফিফা, রয়টার্স, অপটা অ্যানালিস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, স্কাই স্পোর্টস ও অলিম্পিকস ডটকম
-ডালাস বার্তা ডেস্ক