শুধু মেসির জাদু নয়, দল হয়ে লড়াই করেই সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা

লিওনেল মেসি গোল করেননি। আর্জেন্টিনাও নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি। তারপরও সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

Jul 12, 2026 - 20:17
শুধু মেসির জাদু নয়, দল হয়ে লড়াই করেই সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা
ছবি: ফিফা

লিওনেল মেসি গোল করেননি। আর্জেন্টিনাও নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি। তারপরও সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

এই ম্যাচটিই সম্ভবত আর্জেন্টিনার এবারের বিশ্বকাপ যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। দলটি এখনো মেসিকে ঘিরেই খেলে, কিন্তু জয়ের জন্য আর শুধু তার গোলের অপেক্ষায় বসে থাকে না। মেসির প্রভাব এখন গোল করার পাশাপাশি সুযোগ তৈরি করা, প্রতিপক্ষের মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নেওয়া এবং সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলটি আসে মেসির কর্নার থেকে। গোল করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। এরপর ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ জয় নিশ্চিত করেন। অর্থাৎ তিনটি গোলই এসেছে তিনজন ভিন্ন খেলোয়াড়ের কাছ থেকে।

এটাই এই আর্জেন্টিনা দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। মেসি এখনো কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু তার চারপাশে ম্যাচের ফল বদলে দেওয়ার মতো একাধিক খেলোয়াড় রয়েছে। আলভারেজ গতি ও পরিশ্রম দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করেন। লাউতারো বদলি হিসেবে নেমেও গোল করতে পারেন। ম্যাক অ্যালিস্টার মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে যোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সামনে চলে আসেন।

২০২২ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার সাফল্যের মূল কারণ ছিল দলগত ভারসাম্য। চার বছর পর সেই দলের অনেক খেলোয়াড় আরও অভিজ্ঞ হয়েছেন। তারা জানেন নকআউট ম্যাচ কীভাবে খেলতে হয়, কখন গতি কমাতে হয় এবং কখন ঝুঁকি নিতে হয়।

তবে এবারের পথ একেবারেই সহজ ছিল না। শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে একসময় ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। শেষ দিকে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ গোলে জেতে তারা। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও এগিয়ে যাওয়ার পর গোল হজম করে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দিয়েছিল দলটি।

এই দুই ম্যাচ দেখিয়েছে, আর্জেন্টিনা বিপদে পড়লে সহজে ভেঙে পড়ে না। চাপ বাড়লে দলটি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের পথ খুঁজতে থাকে। বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় সুন্দর ফুটবল খেলার পাশাপাশি এই মানসিক শক্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আর্জেন্টিনার আরেকটি সুবিধা হলো তাদের বেঞ্চ। প্রথম একাদশের কোনো খেলোয়াড় ক্লান্ত হয়ে পড়লে বা ম্যাচের পরিকল্পনা কাজ না করলে কোচ লিওনেল স্কালোনির হাতে পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট বিকল্প রয়েছে। একজন ফরোয়ার্ডের বদলে আরেকজন নামলেও দলের গোলের সম্ভাবনা খুব বেশি কমে যায় না।

তবে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দুর্বলতাগুলো আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে দলটি মাঝমাঠে সব সময় নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি। প্রতিপক্ষকে কয়েকটি ভালো সুযোগ দিয়েছে এবং সমতা ফেরানোর পর বেশ কিছু সময় চাপে ছিল।

ইংল্যান্ডের আক্রমণে হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহামের মতো খেলোয়াড় রয়েছেন। তারা আর্জেন্টিনার রক্ষণে পাওয়া ছোট ভুলও কাজে লাগাতে পারেন। বিশেষ করে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং উঁচু বল সামলানোর ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনাকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

মেসির বয়স এখন ৩৯ বছর। তিনি পুরো ম্যাচে আগের মতো একই গতিতে দৌড়াতে পারেন না। ফলে আর্জেন্টিনার অন্য খেলোয়াড়দের তার জন্য বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। মাঝমাঠে বল উদ্ধার করা, প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়া এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে দ্রুত যাওয়ার দায়িত্ব তাদেরই বেশি নিতে হয়।

কিন্তু মেসির উপস্থিতি এখনো প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বদলে দেয়। তাকে আটকাতে একাধিক খেলোয়াড় ব্যস্ত হয়ে পড়লে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি হয়। আর ম্যাচে একটি ফ্রি-কিক, কর্নার বা ছোট পাস দিয়েও তিনি পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।

এই কারণেই আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে ওঠাকে শুধু মেসির আরেকটি সাফল্য হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি এমন একটি দলের সাফল্য, যারা নিজেদের সবচেয়ে বড় তারকাকে ব্যবহার করতে জানে, আবার প্রয়োজনে তার বাইরে গিয়েও জয়ের পথ বের করতে পারে।

তবে সেমিফাইনালে পৌঁছানো আর শিরোপা জেতা এক বিষয় নয়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। বারবার পিছিয়ে পড়ে শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর ওপর নির্ভর করলে এবার হয়তো আর রক্ষা মিলবে না।

আর্জেন্টিনা এখন টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা থেকে মাত্র দুই জয় দূরে। তাদের ফুটবল সব সময় নিখুঁত নয়, কিন্তু দলটি জানে কীভাবে কঠিন ম্যাচ জিততে হয়। বিশ্বকাপের শেষ পর্যায়ে এসে এটিই হয়তো সুন্দর খেলার চেয়েও বেশি মূল্যবান।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স, অপটা অ্যানালিস্ট | ১২ জুলাই, ২০২৬