এক প্রজন্ম যায়, আরেক প্রজন্ম আসে: তবু বিশ্বকাপে ফ্রান্স এত ধারাবাহিক কেন?

ফ্রান্সের এই শক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছে দেশটির বিস্তৃত যুব ফুটবল ব্যবস্থায়। ক্লেরফন্তেইনকে সাধারণত ফরাসি ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। তবে ফ্রান্সের খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা শুধু একটি একাডেমির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশজুড়ে আঞ্চলিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র, পেশাদার ক্লাবের একাডেমি, স্থানীয় ক্লাব এবং প্রশিক্ষিত যুব কোচেরা একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করেন।

Jul 12, 2026 - 20:29
এক প্রজন্ম যায়, আরেক প্রজন্ম আসে: তবু বিশ্বকাপে ফ্রান্স এত ধারাবাহিক কেন?
এআই জেনারেটেড

একটি বিশ্বকাপে ভালো করা কঠিন। সেই সাফল্য পরের বিশ্বকাপেও ধরে রাখা আরও কঠিন। আর টানা তিনটি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠা নিছক কয়েকজন তারকা খেলোয়াড়ের কৃতিত্ব নয়। এর জন্য দরকার বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা পরিকল্পনা, নিয়মিত ভালো খেলোয়াড় তুলে আনার ব্যবস্থা এবং বড় ম্যাচের চাপ সামলানোর অভ্যাস। একই সঙ্গে দরকার এমন একজন কোচ, যিনি প্রজন্ম বদলে গেলেও নতুন খেলোয়াড়দের দ্রুত দলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন এবং প্রতিবারই একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল তৈরি করতে পারেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে ফ্রান্স আবারও প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাদের সাফল্য কোনো একটি প্রজন্মের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। ২০১৮ সালে তারা বিশ্বকাপ জিতেছিল। ২০২২ সালে আবার ফাইনালে উঠে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরেছিল। এবারও তারা শেষ চারে। অর্থাৎ গত তিন বিশ্বকাপেই ফ্রান্স অন্তত সেমিফাইনাল খেলেছে।

এই সময়ের মধ্যে দলটির অনেক পরিচিত মুখ বদলে গেছে। পল পগবা, এনগোলো কান্তে, রাফায়েল ভারান, হুগো লরিস, অলিভিয়ের জিরু ও আঁতোয়ান গ্রিজমানের মতো খেলোয়াড়েরা একসময় ফ্রান্সের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তাদের কেউ অবসর নিয়েছেন, কেউ জাতীয় দলের পরিকল্পনা থেকে সরে গেছেন, আবার কেউ আগের মতো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নেই। কিন্তু দলটির ফলাফল খুব বেশি বদলায়নি।

বরং নতুন খেলোয়াড়েরা এসেছেন এবং পুরোনোদের জায়গা প্রায় স্বাভাবিকভাবেই পূরণ করেছেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে এখন শুধু দলের সবচেয়ে বড় তারকা নন, তিনি অধিনায়ক ও আক্রমণের প্রধান নেতা। তার পাশে উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, দেজিরে দুয়ে, রায়ান শেরকি, অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি, মানু কোনে ও ওয়ারেন জাইর-এমেরির মতো খেলোয়াড়েরা ফ্রান্সকে নতুন চেহারা দিয়েছেন।

এখানেই ফ্রান্সকে অন্য অনেক জাতীয় দল থেকে আলাদা করা যায়। বেশির ভাগ দেশ একটি সফল প্রজন্ম হারানোর পর কয়েক বছর পুনর্গঠনের মধ্যে পড়ে। ফ্রান্সের ক্ষেত্রে পুনর্গঠন যেন দলটির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। একজন চলে গেলে তার জায়গায় এমন আরেকজন আসেন, যিনি ইউরোপের বড় কোনো ক্লাবে নিয়মিত খেলছেন এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলের চাপের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত।

ফ্রান্সের এই শক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছে দেশটির বিস্তৃত যুব ফুটবল ব্যবস্থায়। ক্লেরফন্তেইনকে সাধারণত ফরাসি ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। তবে ফ্রান্সের খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা শুধু একটি একাডেমির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশজুড়ে আঞ্চলিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র, পেশাদার ক্লাবের একাডেমি, স্থানীয় ক্লাব এবং প্রশিক্ষিত যুব কোচেরা একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করেন।

একজন কিশোর ফুটবলারের শারীরিক সক্ষমতা বা গতি দেখেই তাকে বেছে নেওয়া হয় না। তার বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মাঠ বোঝার দক্ষতা এবং বিভিন্ন অবস্থানে খেলার যোগ্যতাও গড়ে তোলা হয়। ফলে ফ্রান্স শুধু দ্রুতগতির ফরোয়ার্ড বা শক্তিশালী ডিফেন্ডার তৈরি করছে না। তারা এমন খেলোয়াড়ও তৈরি করছে, যারা একই ম্যাচে একাধিক ভূমিকা পালন করতে পারে।

২০২৬ বিশ্বকাপে এই ব্যবস্থার গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া প্রায় ১০০ ফুটবলার বিভিন্ন দেশের হয়ে এই বিশ্বকাপে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মাত্র ২৩ জন ফ্রান্সের দলে খেলছেন। বাকিরা আলজেরিয়া, মরক্কো, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, তিউনিসিয়া ও হাইতির মতো দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। অর্থাৎ ফ্রান্সের ফুটবল ব্যবস্থা শুধু নিজেদের জাতীয় দল নয়, আরও অনেক জাতীয় দলের জন্যও আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি করছে।

এই বিপুল প্রতিভার ভাণ্ডার ফ্রান্সের জন্য যেমন বড় সুবিধা, তেমনি কোচের জন্য একটি কঠিন দায়িত্বও। কারণ অনেক ভালো খেলোয়াড় থাকলেই একটি ভালো দল তৈরি হয় না। তারকায় ভরা দল অনেক সময় নিজেদের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পায় না। কেউ পর্যাপ্ত সময় না পেলে অসন্তুষ্ট হতে পারেন, আবার আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় বেশি খেলালে দলের রক্ষণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

দিদিয়ের দেশম এখানেই ফ্রান্সের ধারাবাহিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ। তার ফুটবল সব সময় দর্শনীয় বলে প্রশংসিত হয় না। তাকে অনেক সময় অতিরিক্ত সতর্ক, বাস্তববাদী বা রক্ষণনির্ভর কোচও বলা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে তার দল সাধারণত জানে, কোন মুহূর্তে কী করতে হবে।

ক্লাব ফুটবলে একজন কোচ প্রায় প্রতিদিন খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। জাতীয় দলের কোচ সেই সময় পান না। তাকে অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ক্লাব থেকে আসা খেলোয়াড়দের একটি কার্যকর ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হয়। দেশম সেই কাজটি দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে করে আসছেন।

তার অধীনে ফ্রান্সকে সব ম্যাচে বলের দখল রাখতে হয় না। প্রতিপক্ষ বেশি সময় বল রাখলেও তারা অস্থির হয়ে পড়ে না। আবার সুযোগ এলে এমবাপ্পে, দেম্বেলে বা ওলিসের গতিকে কাজে লাগিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আক্রমণ তৈরি করতে পারে। একই দল প্রয়োজন হলে নিচে নেমে রক্ষণ করতে পারে, আবার প্রতিপক্ষকে তাদের অর্ধে চেপেও ধরতে পারে।

তবে ২০২৬ সালের ফ্রান্স আগের কয়েকটি টুর্নামেন্টের দলের তুলনায় কিছুটা বেশি আক্রমণাত্মক। বিশেষ করে মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তারা শুরু থেকেই উঁচুতে উঠে চাপ প্রয়োগ করেছে। প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধ থেকে সহজে বল বের করতে দেয়নি। একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও প্রথমার্ধে গোল পায়নি। এমনকি এমবাপ্পে পেনাল্টিও মিস করেন।

এ ধরনের ম্যাচে অনেক দল হতাশ হয়ে ভুল করতে শুরু করে। ফ্রান্স তা করেনি। তারা একইভাবে চাপ ধরে রেখেছে এবং দ্বিতীয়ার্ধে এমবাপ্পের গোলে এগিয়ে গেছে। পরে তার পাস থেকে দেম্বেলে দ্বিতীয় গোল করেন। ২-০ গোলের জয়টি শুধু দুই তারকার ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের গল্প ছিল না। এটি ছিল ধৈর্য ধরে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার এবং সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করার উদাহরণ।

এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের যাত্রাতেও তাদের বহুমাত্রিক শক্তি দেখা গেছে। গ্রুপ পর্বে তারা সেনেগালকে হারিয়েছে, ইরাকের বিপক্ষে ৩-০ এবং নরওয়ের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয় পেয়েছে। শেষ বত্রিশে সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারানোর পর শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়ের নিচু ও কঠোর রক্ষণ ভাঙতে তাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। সেই ম্যাচে বড় ব্যবধানে জয় না এলেও ফ্রান্স গোল না খেয়ে এগিয়ে যায়। এরপর মরক্কোর বিরুদ্ধেও নিজেদের গোলপোস্ট অক্ষত রাখে।

এই ফলাফলগুলো দেখায়, ফ্রান্স শুধু খোলা ম্যাচে ভালো খেলে না। প্রতিপক্ষ যদি নিচে নেমে জায়গা বন্ধ করে রাখে, তাহলেও তারা ধৈর্য ধরে সমাধান খুঁজতে পারে। আবার ম্যাচ শারীরিক ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠলেও তারা লড়াই থেকে পিছিয়ে যায় না। একটি দীর্ঘ বিশ্বকাপ জিততে এই দুই ধরনের দক্ষতাই প্রয়োজন।

ফ্রান্সের আধিপত্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক অবশ্যই এমবাপ্পে। ২০১৮ সালে ১৯ বছর বয়সে তিনি বিশ্বকাপ জিতে বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকায় পরিণত হয়েছিলেন। ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও দলকে শিরোপা এনে দিতে পারেননি। ২০২৬ সালে এসে তিনি আরও পরিণত একজন নেতা।

মরক্কোর বিপক্ষে গোলটি ছিল বিশ্বকাপে তার ২০তম গোল। একই বিশ্বকাপে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোতেও তিনি বড় ভূমিকা রাখছেন। তবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়তো পরিসংখ্যানের বাইরে। এখন তাকে শুধু দ্রুতগতির একজন গোলদাতা হিসেবে দেখা যায় না। তিনি ম্যাচের গতি বোঝেন, কখন বল ধরে রাখতে হবে জানেন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ নিজের দিকে টেনে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করেন।

অধিনায়ক হিসেবেও এমবাপ্পে দলের মধ্যে আত্মতুষ্টি আসতে দেননি। বিশ্বকাপে টানা সাফল্য পাওয়া একটি দলের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বারবার বড় মঞ্চে পৌঁছানোর পর খেলোয়াড়দের মধ্যে কখনো কখনো এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে তারা শুধু প্রতিভার জোরেই জিতে যাবে। বর্তমান ফ্রান্সের মধ্যে এখন পর্যন্ত সেই মানসিকতা দেখা যায়নি।

এমবাপ্পের উপস্থিতি অবশ্য প্রতিপক্ষের জন্য একটি বড় কৌশলগত সমস্যা তৈরি করে। তাকে থামাতে একজন ডিফেন্ডার যথেষ্ট নয়। প্রায়ই দুই বা তিনজন খেলোয়াড়কে তার দিকে নজর রাখতে হয়। এতে অন্য পাশে দেম্বেলে, ওলিসে বা দুয়ের জন্য জায়গা তৈরি হয়। ফলে এমবাপ্পে গোল না করলেও তার উপস্থিতি ফ্রান্সের আক্রমণকে সাহায্য করে।

দেম্বেলের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু গতি দিয়ে ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করেন না, দুই পায়ে খেলতে পারেন এবং মাঠের বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ তৈরি করতে পারেন। এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পে ও দেম্বেলে মিলে যে পরিমাণ গোল ও গোলে সহায়তা করেছেন, তা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা আক্রমণাত্মক জুটিগুলোর সঙ্গে তুলনা তৈরি করেছে।

মাইকেল ওলিসে ফ্রান্সের আক্রমণে আরেক ধরনের ভারসাম্য এনেছেন। তিনি শুধু সরাসরি ডিফেন্ডারের দিকে ছুটে যান না। মাঝমাঠে নেমে বল নিতে, ছোট পাসে আক্রমণ গড়তে এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণের মাঝের ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিতে পারেন। এর ফলে ফ্রান্সকে শুধু পাল্টা আক্রমণের দল বলা যায় না।

মাঝমাঠেও ফ্রান্সের বিকল্পের অভাব নেই। চুয়ামেনি বল কেড়ে নেওয়া, রক্ষণকে সুরক্ষা দেওয়া এবং পেছন থেকে আক্রমণ শুরু করার কাজ করেন। তার অনুপস্থিতিতে মানু কোনে মরক্কোর বিপক্ষে দায়িত্ব নিয়ে দেখিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড় না থাকলেও ফ্রান্সের পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে না। এটিই তাদের স্কোয়াডের গভীরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

তবে এত সাফল্যের পরও ফ্রান্স নিখুঁত দল নয়। তাদের প্রথম দুর্বলতা হলো সুযোগ নষ্ট করা। মরক্কোর বিপক্ষে তারা অনেক সুযোগ তৈরি করেছিল, কিন্তু ম্যাচের অনেকটা সময় গোল পায়নি। এমবাপ্পে পেনাল্টি মিস করেছেন, অন্য খেলোয়াড়েরাও ভালো অবস্থান থেকে গোল করতে পারেননি। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন সুযোগ বারবার পাওয়া যাবে না।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি তাদের রক্ষণ নিয়ে। এখন পর্যন্ত নকআউট পর্বে ফ্রান্সের রক্ষণ খুব বেশি পরীক্ষার মুখে পড়েনি। প্যারাগুয়ে মূলত নিচে নেমে খেলেছে। মরক্কোও আক্রমণে খুব বেশি ঝুঁকি নিতে পারেনি। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা হবে।

স্পেন দীর্ঘ সময় বল নিজের কাছে রাখতে পারে। তাদের খেলোয়াড়েরা ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের চাপ ভাঙে এবং দ্রুত বল হারালে সঙ্গে সঙ্গে আবার চাপ দেয়। ফ্রান্স যদি স্পেনের বিপক্ষে অনেকটা সময় বল ছাড়া থাকে, তাহলে তাদের রক্ষণ, মাঝমাঠ এবং আক্রমণের মধ্যকার দূরত্ব ঠিক রাখতে হবে।

ফ্রান্সের আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়েরা সামনে বেশি সময় থাকলে মাঝমাঠে স্পেন বাড়তি খেলোয়াড়ের সুবিধা নিতে পারে। আবার এমবাপ্পে ও দেম্বেলে যদি রক্ষণে খুব নিচে নেমে যান, তাহলে বল ফিরে পাওয়ার পর দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সুযোগ কমে যাবে। দেশমকে এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে।

স্পেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের বড় অস্ত্র হবে গতি। স্পেন সাধারণত রক্ষণরেখা অনেক ওপরে তোলে। তাদের আক্রমণ ভেঙে গেলে পেছনে জায়গা তৈরি হতে পারে। সেই জায়গায় এমবাপ্পে বা দেম্বেলেকে বল দেওয়া গেলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে।

অন্যদিকে স্পেন যদি বলের দখল রেখে ফ্রান্সকে ধৈর্য হারাতে বাধ্য করে, তাহলে ম্যাচটি দেশমের দলের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। তাই এই সেমিফাইনাল শুধু দুই শক্তিশালী দলের লড়াই নয়। এটি দুই ভিন্ন ধরনের ফুটবল চিন্তার পরীক্ষাও। একদিকে স্পেন বল নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে চায়। অন্যদিকে ফ্রান্স কম সময়ের মধ্যে দ্রুত ও ভয়ংকর আঘাত করতে পারে।

ফ্রান্সের আধিপত্যের রহস্য তাই শুধু এমবাপ্পের গতি, দেম্বেলের কৌশল বা দেশমের অভিজ্ঞতার মধ্যে নেই। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পুরো ব্যবস্থাটি। তারা একই সঙ্গে খেলোয়াড় তৈরি করে, নতুনদের সুযোগ দেয়, অভিজ্ঞদের সঙ্গে তাদের মিশিয়ে দেয় এবং প্রতিটি টুর্নামেন্টের প্রয়োজন অনুযায়ী খেলার ধরন বদলায়।

২০১৮ সালের ফ্রান্স ছিল তরুণ, দ্রুতগতির এবং ভয়হীন। ২০২২ সালের দলটি ছিল বেশি অভিজ্ঞ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলাতে সক্ষম। ২০২৬ সালের দলটি আগের দুই সংস্করণের বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বহন করছে। তাদের গতি আছে, অভিজ্ঞতা আছে, স্কোয়াডের গভীরতা আছে এবং প্রয়োজন হলে খেলার ধরন পরিবর্তন করার ক্ষমতাও আছে।

প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু ফ্রান্সের লক্ষ্য বদলায়নি। তাদের কাছে এখন সেমিফাইনালে ওঠা আর বিস্ময়কর সাফল্য নয়। এটি প্রায় প্রত্যাশিত ফলাফলে পরিণত হয়েছে। এই প্রত্যাশার ভার বহন করেও দলটি প্রতি বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকছে।

তবে আধিপত্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ সেমিফাইনালে ওঠা নয়, শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতা। স্পেনকে হারাতে পারলে ফ্রান্স টানা তৃতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছাবে। আর শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হলে ২৮ বছরের মধ্যে তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জিতবে তারা।

সূত্র: ফিফা, দ্য গার্ডিয়ান, ল্য মঁদ, ফিফা ট্রেনিং সেন্টার ও ফক্স স্পোর্টস

-ডালাস বার্তা ডেস্ক