মেসিকে ঘিরে, কিন্তু শুধু মেসিনির্ভর নয়: টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতবে আর্জেন্টিনা?

বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া কঠিন। সেই শিরোপা চার বছর পর ধরে রাখা আরও কঠিন। ফুটবলের ইতিহাসে বহু শক্তিশালী দল বিশ্বকাপ জিতেছে, কিন্তু পরের আসরে একই সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি। খেলোয়াড়ের বয়স বাড়ে, প্রতিপক্ষ আরও ভালো প্রস্তুতি নেয়, প্রত্যাশার চাপ বেড়ে যায় এবং আগের চ্যাম্পিয়নদের হারানো অন্য সব দলের জন্য আলাদা প্রেরণায় পরিণত হয়।

Jul 13, 2026 - 20:56
মেসিকে ঘিরে, কিন্তু শুধু মেসিনির্ভর নয়: টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতবে আর্জেন্টিনা?
এআই জেনারেটেড

বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া কঠিন। সেই শিরোপা চার বছর পর ধরে রাখা আরও কঠিন। ফুটবলের ইতিহাসে বহু শক্তিশালী দল বিশ্বকাপ জিতেছে, কিন্তু পরের আসরে একই সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি। খেলোয়াড়ের বয়স বাড়ে, প্রতিপক্ষ আরও ভালো প্রস্তুতি নেয়, প্রত্যাশার চাপ বেড়ে যায় এবং আগের চ্যাম্পিয়নদের হারানো অন্য সব দলের জন্য আলাদা প্রেরণায় পরিণত হয়।

আর্জেন্টিনার সামনে এখন সেই কঠিন পরীক্ষা। ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জেতার পর তারা ২০২৬ আসরেও সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। সামনে ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচ জিততে পারলে তারা টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠবে। আর শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারলে ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পরপর দুই বিশ্বকাপ জেতা ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে এই কীর্তি গড়বে।

স্বাভাবিকভাবেই এই যাত্রার কেন্দ্রে আছেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় তারকা, আক্রমণের সৃজনশীল কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের একজন। এই বিশ্বকাপে আট গোল করে তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়েও আছেন।

তবে বর্তমান আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত অন্য জায়গায়। দলটি মেসিকে ঘিরে তৈরি, কিন্তু শুধু মেসির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো দি পল, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও আরও কয়েকজন খেলোয়াড় এখন নিয়মিতভাবে ম্যাচের দায়িত্ব নিচ্ছেন।

মেসি গোল না করলেও আর্জেন্টিনা জিততে পারে। তিনি পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও অন্যরা সামনে এগিয়ে আসতে পারে। আর এটিই তাদের টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় আশা।

চ্যাম্পিয়নদের যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না

আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে পৌঁছেছে বলে তাদের যাত্রা খুব স্বচ্ছন্দ ছিল, এমনটি বলা যাবে না। বরং নকআউট পর্বের কয়েকটি ম্যাচে তারা বিদায়ের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।

শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়টি শুরুতে সহজ মনে হলেও ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনাকে চাপের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত তারা ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল।

সেই অবস্থান থেকে ফিরে আসা সহজ ছিল না। একটি গোল পেলেও সময় খুব কম ছিল। কিন্তু ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর গোল আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে ফেরায়। এরপর মেসি সমতা আনেন এবং যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের গোলে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা ৩-২ ব্যবধানে জয় পায়।

এই ম্যাচে মেসি একটি পেনাল্টিও মিস করেছিলেন। সাধারণত এমন ভুলের পর একটি দলের আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যখন তারা দুই গোলে পিছিয়ে থাকে। কিন্তু আর্জেন্টিনা ম্যাচ ছেড়ে দেয়নি।

মিশরের বিপক্ষে প্রত্যাবর্তন দেখিয়েছে, এই দলের মানসিক শক্তি এখনো অটুট। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে হারের পর যেভাবে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, সেই একই ধরনের জেদ বর্তমান দলেও রয়েছে।

কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও আর্জেন্টিনাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। প্রথমার্ধে মেসির কর্নার থেকে ম্যাক অ্যালিস্টার গোল করে এগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে দান এনদোয়ে সমতা ফেরান।

সুইজারল্যান্ড পরে ১০ জনের দলে পরিণত হলেও আর্জেন্টিনা স্বাভাবিক সময়ে জয়সূচক গোল করতে পারেনি। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে গোল করেন। পরে লাউতারো মার্তিনেজ আরেকটি গোল করে ৩-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন।

স্কোরলাইন দেখে মনে হতে পারে আর্জেন্টিনা সহজে জিতেছে। বাস্তবে ম্যাচটি দীর্ঘ সময় সমান ছিল। অতিরিক্ত সময়ের শেষ ভাগ পর্যন্ত তারা সেমিফাইনালের জায়গা নিশ্চিত করতে পারেনি।

একদিক থেকে এটি আর্জেন্টিনার দুর্বলতা দেখায়। তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ সব সময় ধরে রাখতে পারছে না, সুযোগ নষ্ট করছে এবং তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষকেও ম্যাচে থাকার সুযোগ দিচ্ছে।

অন্যদিকে এটি তাদের শক্তিও দেখায়। ম্যাচ যত কঠিনই হোক, তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের পথ খোঁজে। কোনো একজন আটকে গেলে অন্য কেউ সামনে আসে।

মেসি এখনো কেন্দ্র, কিন্তু তার ভূমিকা বদলেছে

২০২২ সালের বিশ্বকাপে মেসি প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই আর্জেন্টিনার প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন। তিনি গোল করেছেন, গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন এবং দলের আক্রমণের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন।

২০২৬ সালেও তার গুরুত্ব কমেনি। তবে তার ভূমিকা কিছুটা বদলেছে।

বয়সের কারণে মেসি এখন আর পুরো ম্যাচ একই গতিতে খেলেন না। তিনি সব সময় প্রতিপক্ষকে চাপ দিতে দৌড়ান না। রক্ষণে তার দায়িত্বও সীমিত। অনেক সময় তাকে মাঠের মাঝখানে ধীরে হাঁটতে দেখা যায়।

কিন্তু এই সময়েই তিনি প্রতিপক্ষের অবস্থান দেখেন এবং কোথায় জায়গা তৈরি হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করেন। বল পেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এমন পাস দিতে পারেন, যা পুরো রক্ষণকে ভেঙে দেয়।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি গোল করতে পারেননি। বিশ্বকাপে তার টানা গোল করার ধারাও সেই ম্যাচে থেমেছে। তবু ম্যাক অ্যালিস্টারের প্রথম গোলটি তার কর্নার থেকেই আসে। তিনি আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেন এবং নিজেও গোলের কাছাকাছি গিয়েছিলেন।

এটি দেখায়, মেসির কার্যকারিতা শুধু গোলের সংখ্যায় মাপা যায় না। তাকে ঘিরে প্রতিপক্ষের কয়েকজন খেলোয়াড় ব্যস্ত থাকেন। ফলে আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার বা অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি হয়।

তবে মেসির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, এমনটিও নয়। মিশরের বিপক্ষে তিনি সমতাসূচক গোল না করলে আর্জেন্টিনার বিদায়ও ঘটতে পারত। কঠিন সময়ে সবাই এখনো তার দিকে তাকায়।

মূল পার্থক্য হলো, বর্তমান আর্জেন্টিনায় মেসিকে একাই সব করতে হয় না। তাকে গোল করতে না পারলেও পাস দিতে পারেন। পাস না পেলেও তার উপস্থিতি অন্যদের জায়গা তৈরি করে দেয়। আর ম্যাচের শেষ অংশে অন্য খেলোয়াড়েরা দায়িত্ব নিতে পারেন।

হুলিয়ান আলভারেজের উত্থান

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা যখন দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও গোল পাচ্ছিল না, তখন ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি তৈরি করেন হুলিয়ান আলভারেজ।

অতিরিক্ত সময়ের ১১২ মিনিটে তার দূরপাল্লার শট শুধু একটি গোল ছিল না। সেটি ছিল এমন একজন খেলোয়াড়ের সিদ্ধান্ত, যিনি বুঝেছিলেন আর অপেক্ষা করার সময় নেই। প্রতিপক্ষের রক্ষণ গুছিয়ে ছিল, বক্সের ভেতরে জায়গা কম ছিল। তাই তিনি বাইরে থেকে শট নেন।

আলভারেজের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বহুমুখিতা। তিনি মূল স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতে পারেন, মেসির পাশে দ্বিতীয় ফরোয়ার্ড হতে পারেন, আবার মাঠের দুই পাশেও সরে যেতে পারেন।

তার দৌড় আর্জেন্টিনার আক্রমণকে জীবন্ত রাখে। মেসি যেখানে কিছুটা কম দৌড়ান, আলভারেজ সেখানে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ওপর চাপ তৈরি করেন। বল হারালে তিনি সামনে থেকে ছুটে যান এবং প্রতিপক্ষকে সহজে আক্রমণ শুরু করতে দেন না।

মেসি নিচে নেমে বল নিলে আলভারেজ পেছনের ফাঁকা জায়গায় দৌড়ান। এতে ডিফেন্ডাররা সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যায় পড়ে। তারা মেসিকে অনুসরণ করলে আলভারেজের সামনে জায়গা তৈরি হয়। আবার পেছনে থাকলে মেসি বল নিয়ে ঘুরতে পারেন।

মিশরের বিপক্ষে মেসির গোলের আগে আলভারেজের পাসও তার সৃজনশীলতার উদাহরণ। তিনি শুধু গোলদাতা নন, অন্যদের জন্যও সুযোগ তৈরি করতে পারেন।

টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিততে হলে আর্জেন্টিনার এমন একজন ফরোয়ার্ড প্রয়োজন, যিনি মেসির পাশে দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন। আলভারেজ এখন সেই ভূমিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।

লাউতারোর ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ

লাউতারো মার্তিনেজ অনেক সময় প্রথম একাদশে না থাকলেও আর্জেন্টিনার জন্য বড় অস্ত্র। ম্যাচের শেষ দিকে তাকে নামানো হলে তিনি ক্লান্ত ডিফেন্ডারদের বিরুদ্ধে নতুন চাপ তৈরি করেন।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে তার গোল জয় নিশ্চিত করে। এটি শুধু পরিসংখ্যান বাড়ানোর গোল ছিল না। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় একটি ভুল বা একটি সেট পিস থেকেও সুইজারল্যান্ড সমতা ফেরাতে পারত। লাউতারোর গোল সেই আশঙ্কা শেষ করে দেয়।

তার উপস্থিতি স্কালোনিকে কৌশল বদলানোর সুযোগ দেয়। প্রয়োজন হলে আলভারেজ ও লাউতারোকে একসঙ্গে খেলানো যায়। তখন মেসি আরও নিচে নেমে সৃজনশীল ভূমিকা নিতে পারেন।

আবার ম্যাচে লিড থাকলে লাউতারো সামনে থেকে বল ধরে রাখতে পারেন এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পেছনে ব্যস্ত রাখতে পারেন।

২০২২ বিশ্বকাপে লাউতারো প্রত্যাশা অনুযায়ী গোল করতে পারেননি। কিন্তু বর্তমান দলে তিনি আগের তুলনায় বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং বড় মুহূর্তে অবদান রাখছেন।

এটি আর্জেন্টিনাকে একটি বড় সুবিধা দেয়। তাদের কাছে শুধু একটি নির্দিষ্ট আক্রমণভাগ নেই। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী আলভারেজ, লাউতারো ও মেসির ভূমিকা বদলানো যায়।

মাঝমাঠই আর্জেন্টিনার আসল ভিত্তি

মেসি আর্জেন্টিনার মুখ, কিন্তু দলের কাঠামোর ভিত্তি মাঝমাঠ। রদ্রিগো দি পল, এনজো ফার্নান্দেজ এবং আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার একসঙ্গে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করেন, যা মেসিকে স্বাধীনভাবে খেলতে সাহায্য করে।

দি পল দলের সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করা খেলোয়াড়দের একজন। তিনি মাঠের বড় অংশজুড়ে দৌড়ান, বল কেড়ে নেন, মেসির পাশে সহায়তা করেন এবং রক্ষণেও ফিরে আসেন।

অনেক সময় মেসির রক্ষণাত্মক দায়িত্ব দি পলকে পূরণ করতে হয়। প্রতিপক্ষ যখন আর্জেন্টিনার ডান পাশ দিয়ে আক্রমণ করে, তখন তিনি নিচে নেমে জায়গা বন্ধ করেন।

এনজো ফার্নান্দেজ পেছন থেকে বল এগিয়ে নেওয়ার কাজ করেন। তিনি দ্রুত পাসে আক্রমণ বদলাতে পারেন এবং সুযোগ পেলে বক্সের কাছেও পৌঁছে যান। মিশরের বিপক্ষে তার দেরিতে করা জয়সূচক গোল সেই উপস্থিতির উদাহরণ।

ম্যাক অ্যালিস্টার তুলনামূলক শান্ত খেলোয়াড়, কিন্তু তার সিদ্ধান্ত খুব কার্যকর। তিনি বল ধরে রাখতে পারেন, প্রতিপক্ষের চাপ থেকে বেরিয়ে আসেন এবং সঠিক সময়ে বক্সে ঢোকেন।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির কর্নার থেকে তার হেডে গোল করা দেখিয়েছে, তিনি শুধু মাঝমাঠে পাস দেওয়ার খেলোয়াড় নন। গোলের জায়গায়ও পৌঁছাতে পারেন।

এই তিনজনের কারণে আর্জেন্টিনা একাধিকভাবে খেলতে পারে। বলের দখল প্রয়োজন হলে তারা ছোট পাসে নিয়ন্ত্রণ রাখে। প্রতিপক্ষ বেশি চাপ দিলে দ্রুত সামনে বল পাঠায়। আবার ম্যাচ শারীরিক হয়ে উঠলে লড়াই করতেও পিছিয়ে যায় না।

স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি নমনীয়তা

লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, দলটি একটি মাত্র কৌশলে আটকে থাকে না।

কাগজে তারা কখনো ৪-৩-৩, কখনো ৪-৪-২, আবার কখনো ৪-২-৩-১ ছকে খেলতে পারে। কিন্তু ম্যাচের মধ্যে সেই ছক নিয়মিত বদলায়।

বল না থাকলে তারা প্রায়ই দুই সারিতে চারজন করে খেলোয়াড় রেখে জায়গা ছোট করে। মেসি ও আলভারেজ সামনে থাকেন। এতে প্রতিপক্ষকে মাঝখান দিয়ে আক্রমণ করতে সমস্যা হয়।

বল পেলে মেসি স্বাধীনভাবে জায়গা বদল করেন। তিনি ডান পাশ, মাঝখান বা আরও নিচে নেমে বল নিতে পারেন। তার জায়গা খালি হলে আলভারেজ বা কোনো মাঝমাঠের খেলোয়াড় সেটি পূরণ করেন।

স্কালোনি প্রয়োজনে ম্যাচের মাঝেই পরিকল্পনা বদলাতে ভয় পান না। ২০২২ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্সের বিপক্ষে তিনি আলাদা কৌশল নিয়েছিলেন। ২০২৬ সালেও প্রতিপক্ষ অনুযায়ী একই ধরনের নমনীয়তা দেখা যাচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ আটকে গেলে তিনি বেঞ্চ ব্যবহার করেছেন এবং আক্রমণে নতুন শক্তি এনেছেন। লাউতারো পরে নেমে গোল করেছেন। দলের অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে এই ভারসাম্য আর্জেন্টিনার বড় শক্তি।

তবে কৌশল বদলানোর প্রয়োজন বারবার তৈরি হওয়া একটি সতর্কতার বিষয়ও। এর মানে, প্রাথমিক পরিকল্পনা সব সময় কাজ করছে না।

আর্জেন্টিনার রক্ষণ কতটা নিরাপদ?

২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সাফল্যে রক্ষণের বড় ভূমিকা ছিল। রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি, নাহুয়েল মোলিনা, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো এবং গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ দলকে কঠিন মুহূর্তে বাঁচিয়েছিলেন।

২০২৬ সালেও তাদের অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু রক্ষণ সব সময় আগের মতো নিরাপদ দেখাচ্ছে না।

কেপ ভার্দে দুই গোল করেছে। মিশরও দুই গোলের লিড নিয়েছিল। সুইজারল্যান্ড দ্বিতীয়ার্ধে সমতা ফিরিয়েছে এবং কিছু সময় আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতে রেখেছে।

রক্ষণরেখা ওপরে থাকলে পেছনে জায়গা তৈরি হচ্ছে। দুই ফুলব্যাক সামনে গেলে পাল্টা আক্রমণে মাঝের ডিফেন্ডারদের বড় এলাকা সামলাতে হচ্ছে।

রোমেরো শক্তিশালী ও আক্রমণাত্মক ডিফেন্ডার। তবে তিনি কখনো কখনো প্রতিপক্ষকে থামাতে খুব দ্রুত সামনে চলে যান। ট্যাকল ভুল হলে পেছনে বড় জায়গা খালি হয়ে যায়।

ওতামেন্দির অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু বয়সের কারণে দ্রুতগতির ফরোয়ার্ডের বিপক্ষে তাকে সতর্ক থাকতে হয়। ইংল্যান্ডের সাকা, বেলিংহাম বা অন্য কোনো দ্রুত খেলোয়াড় পেছনের জায়গায় ঢুকলে আর্জেন্টিনার জন্য সমস্যা হতে পারে।

এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এখনো বড় মুহূর্তে আত্মবিশ্বাসী। পেনাল্টি, একের বিপক্ষে একজন এবং ম্যাচের শেষ দিকে চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে তার খ্যাতি রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচ গোলরক্ষকের নৈপুণ্যে বাঁচানো সম্ভব নয়।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে আগের ম্যাচগুলোর তুলনায় বেশি সংগঠিত থাকতে হবে।

তিন ম্যাচের চাপ কি সমস্যা হয়ে উঠবে?

আর্জেন্টিনার নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোতে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির বড় পরীক্ষা হয়েছে। মিশরের বিপক্ষে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ গড়িয়েছে অতিরিক্ত সময়ে।

দীর্ঘ ম্যাচ, গরম আবহাওয়া এবং অল্প সময়ের বিশ্রাম অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মেসি ও ওতামেন্দির মতো বয়সী খেলোয়াড়দের শক্তি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।

মেসিকে পুরো ম্যাচ একই গতিতে খেলানোর প্রয়োজন নেই। স্কালোনি তাকে এমন সময় ও জায়গায় সক্রিয় রাখতে চান, যেখানে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারেন।

তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ যদি আবার অতিরিক্ত সময়ে যায়, তখন আর্জেন্টিনার শারীরিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ইংল্যান্ডের বেঞ্চ তুলনামূলক তরুণ ও গভীর। তারা শেষ দিকে নতুন গতির খেলোয়াড় নামাতে পারে।

আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা তাদের শান্ত রাখবে, কিন্তু ক্লান্তি পুরোপুরি অভিজ্ঞতা দিয়ে দূর করা যায় না।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা কী হতে পারে?

ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের শারীরিক সক্ষমতা, বেলিংহামের বক্সে ঢোকা এবং কেইনের গোল করার ক্ষমতা।

আর্জেন্টিনাকে প্রথমেই কেইনকে বক্সের সামনে সহজে বল পেতে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তিনি শুধু গোল করেন না, নিচে নেমে বল ধরে বেলিংহাম ও অন্যদের সামনে যাওয়ার জায়গা তৈরি করেন।

কেইন নিচে নামলে রোমেরো তাকে অনুসরণ করবেন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। রোমেরো খুব বেশি সামনে গেলে বেলিংহাম তার পেছনের জায়গায় ঢুকে পড়তে পারেন।

মাঝমাঠে ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ও দি পলকে বেলিংহামের দৌড় নজরে রাখতে হবে। শুধু বলের দিকে তাকালে চলবে না। কারণ বেলিংহাম প্রায়ই পেছন থেকে এমন সময়ে বক্সে ঢোকেন, যখন ডিফেন্ডাররা কেইনের দিকে ব্যস্ত থাকে।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে সমস্যায় ফেলতে মেসি ও আলভারেজের সম্পর্ক বড় অস্ত্র হতে পারে। কেইন, বেলিংহাম ও ইংল্যান্ডের আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়েরা সামনে উঠলে তাদের মাঝমাঠের পেছনে জায়গা তৈরি হতে পারে।

মেসি সেই জায়গায় বল পেলে আলভারেজকে পেছনে দৌড়াতে দিতে পারেন। লাউতারো পরে নামলে ইংল্যান্ডের ক্লান্ত ডিফেন্ডারদের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।

ইংল্যান্ডের সেট পিসও বড় হুমকি। কেইন, বেলিংহাম, ডেকলান রাইস ও ডিফেন্ডাররা বাতাসে শক্তিশালী। আর্জেন্টিনাকে অপ্রয়োজনীয় ফাউল ও কর্নার দেওয়া এড়াতে হবে।

ইতিহাসের চাপ কার ওপর বেশি?

ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে বহু আলোচিত ম্যাচ রয়েছে। ১৯৬৬ সালের বিতর্ক, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার দুটি ঐতিহাসিক গোল, ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড এবং ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের জয় এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।

তবে আর্জেন্টিনা আপাতত সেই ইতিহাস নিয়ে অতিরিক্ত আবেগ তৈরি করতে চাইছে না। দলের খেলোয়াড় ও কোচেরা ম্যাচটিকে একটি সেমিফাইনাল হিসেবেই দেখানোর চেষ্টা করছেন।

এটি স্কালোনির দলের মানসিকতার সঙ্গে মানানসই। তারা সাধারণত আবেগকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে, কিন্তু পরিকল্পনার ওপর আবেগকে প্রাধান্য দিতে চায় না।

ইংল্যান্ডের ওপর সম্ভবত চাপ বেশি থাকবে। তারা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপ জেতেনি। বর্তমান দলকে প্রতিটি বড় ম্যাচেই সেই ইতিহাসের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।

আর্জেন্টিনা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। তাদের ওপর শিরোপা ধরে রাখার চাপ আছে, কিন্তু একই সঙ্গে ২০২২ সালের সাফল্য থেকে আসা আত্মবিশ্বাসও রয়েছে।

তারা জানে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ কীভাবে জিততে হয়। ম্যাচ খারাপ গেলেও কীভাবে টিকে থাকতে হয়, সেটিও জানে।

তাহলে কি আর্জেন্টিনা আবার বিশ্বকাপ জিতবে?

আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতার মতো দল আছে। তাদের কাছে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মেসি আছেন। আলভারেজ ও লাউতারোর মতো দুই ধরনের ফরোয়ার্ড আছে। মাঝমাঠে ভারসাম্য, রক্ষণে অভিজ্ঞতা এবং গোলপোস্টের নিচে বড় ম্যাচের পরীক্ষিত একজন গোলরক্ষক আছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই দলটি বিপদের সময় ভেঙে পড়ে না। মিশরের বিপক্ষে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত দুই গোলে পিছিয়েও তারা জিতেছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে সমতা হারানোর পর অতিরিক্ত সময়ে পথ বের করেছে।

তবে তাদের দুর্বলতাও স্পষ্ট। রক্ষণ সুযোগ দিচ্ছে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ মাঝেমধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি ম্যাচে জয় পেতে স্বাভাবিক সময়ের শেষ মুহূর্ত বা অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

ইংল্যান্ড সেই ভুলগুলো কাজে লাগানোর মতো দল। বেলিংহাম ও কেইনের গোলের ক্ষমতা আছে। তাদের বেঞ্চ শক্তিশালী এবং শারীরিকভাবে তারা আর্জেন্টিনাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে।

তাই আর্জেন্টিনাকে শুধু অভিজ্ঞতা বা মেসির জাদুর ওপর ভরসা করলে চলবে না। তাদের পুরো দলকে একসঙ্গে ভালো খেলতে হবে।

মেসি হয়তো আবারও ম্যাচের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত তৈরি করবেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার সম্ভাবনা নির্ভর করবে আলভারেজের দৌড়, লাউতারোর গোল, ম্যাক অ্যালিস্টারের বুদ্ধি, দি পলের পরিশ্রম, রোমেরোর রক্ষণ এবং এমিলিয়ানো মার্তিনেজের স্থিরতার ওপরও।

এই দলটি মেসিকে ঘিরে তৈরি, কিন্তু শুধু মেসির দল নয়। ২০২২ সালে সেটিই তাদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিল। ২০২৬ সালে সেই দলীয় শক্তিই তাদের ইতিহাস গড়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ এনে দিয়েছে।

এখন সামনে মাত্র দুই ম্যাচ। প্রথমটি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। সেটি জিততে পারলে আর্জেন্টিনা আবার ফাইনালে উঠবে এবং টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আরও বাস্তব হয়ে উঠবে।

ব্রাজিলের ১৯৬২ সালের কীর্তির পর দীর্ঘ ৬৪ বছর ধরে কোনো দল বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারেনি। আর্জেন্টিনা কি সেই অপেক্ষা শেষ করবে?

উত্তরটি শুধু মেসির পায়ে লেখা হবে না। লিখতে হবে পুরো আর্জেন্টিনা দলকে।

সূত্র: ফিফা, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা ও ফক্স স্পোর্টস