চ্যাটজিপিটিতে সেলফি আপলোড কতটা নিরাপদ

placeholder

Sep 21, 2026 - 17:10
চ্যাটজিপিটিতে সেলফি আপলোড কতটা নিরাপদ
উইকিমিডিয়া কমন্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আশির দশকের ছবি বানানো এখন ট্রেন্ড। চোখের পলকে নিজের আশির দশকের স্টাইলিশ ছবি বানিয়ে নেওয়া বেশ মজার। তবে এই আনন্দের আড়ালে বড় এক ঝুঁকিও আছে। প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী ওয়্যারডের মতে, চ্যাটবটে নিজের সেলফি বা ব্যক্তিগত ছবি আপলোড করা মোটেও নিরাপদ নয়।

চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইয়ের মতো এআই চ্যাটবটের সঙ্গে মানুষের মতো কথা বলা যায় বলে অনেকেই ধরে নেন, এগুলোতে দেওয়া তথ্য সম্পূর্ণ গোপন থাকে। কিন্তু বাস্তবে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর গোপনীয়তা শতভাগ সুরক্ষিত নয়। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইকে কোনো ছবি বা লেখা দিলে মূলত চার ধরনের তথ্য তাদের কাছে চলে যায়: লেখা বা কথা, লেখা থেকে বিশ্লেষণ করা তথ্য, ব্যবহারের পরিসংখ্যান এবং আপলোড করা ছবি ও ফাইল।

তাই গোপনীয় কোনো তথ্য, ফোন নম্বর বা স্পর্শকাতর ছবি এআইকে দেওয়ার আগে ভালো করে ভাবা দরকার। চ্যাটজিপিটির নিজস্ব নিয়মেও স্পষ্ট বলা আছে, যে তথ্য গোপন রাখতে চান, তা কোনোভাবেই তাদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।

এআই চ্যাটবট কী কী তথ্য সংগ্রহ করে

এআই চ্যাটবটে কোনো লেখা টাইপ করলে সেটি শব্দগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভেঙে ফেলে। কোটি কোটি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষিত একটি ডিজিটাল মডেলের সাহায্যে ব্যবহারকারীর কথা, বিষয় ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করে নতুন উত্তর তৈরি করে।

ছবির ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও বেশি। মুখমণ্ডলের ছবি একটি অতিসংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য, কারণ এর মাধ্যমে কাউকে সরাসরি শনাক্ত করা সম্ভব। এ ছাড়া ছবির সঙ্গে যুক্ত থাকে মেটাডেটা, যেমন ছবি তোলার নির্দিষ্ট সময়, ডিভাইসের তথ্য এবং ভৌগোলিক অবস্থান।

সেলফি আপলোড করলেই তা সঙ্গে সঙ্গে চুরি হয়ে যাবে বা ডিপফেক তৈরিতে ব্যবহৃত হবে, বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। তবে সেই ছবির একটি ডিজিটাল কপি সরাসরি অন্য একটি বিদেশি কোম্পানির সার্ভারে জমা হয়ে যায় এবং তাদের নিজস্ব নীতিমালার অধীন হয়ে পড়ে।

নিয়মিত এআই ব্যবহার করলে প্রশ্ন ও লেখার ধরন বিশ্লেষণ করেই ব্যবহারকারীর পেশা, পছন্দ এবং ব্যক্তিগত অভ্যাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যায় এআই। অন্যান্য অনলাইন সেবার মতোই এআই চ্যাটবট আইপি অ্যাড্রেস, ফোন বা কম্পিউটারের ধরন এবং অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে। এমনকি ব্যবহারকারীর দেওয়া উত্তর, আপলোড করা ছবি ও ফাইলও তারা জমা রাখে, যাতে সিস্টেমকে আরও দক্ষ করে তোলা যায়।

তথ্য কত দিন জমা থাকে

তথ্য কত দিন সংরক্ষিত থাকবে, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট টুলের প্রাইভেসি পলিসির ওপর। চ্যাটজিপিটিতে চ্যাট হিস্ট্রি ব্যবহারকারী নিজে না মোছা পর্যন্ত অ্যাকাউন্টে জমা থাকে। মুছে দিলেও ওপেনএআইয়ের মূল সিস্টেমে তা ৩০ দিন পর্যন্ত থেকে যায়। তথ্য থেকে ব্যবহারকারীর পরিচয় আলাদা করে ফেলা হলে নিরাপত্তার স্বার্থে তা আরও দীর্ঘ সময় তাদের কাছে থাকতে পারে।

গুগলের জেমিনাই ডিফল্ট সেটিংসে ১৮ মাস পর্যন্ত কথোপকথন জমা রাখে। জেমিনাই গুগলের ড্রাইভ বা ফটোজের মতো অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকায় এটি আরও বেশি ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশ করতে পারে। গুগল স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছে, অন্যকে দেখাতে চান না এমন গোপন তথ্য এআইকে দেওয়া উচিত নয়।

অ্যানথ্রোপিকের ক্লডে চ্যাট মুছে ফেলার ৩০ দিনের মধ্যে ব্যাক এন্ড থেকে তা মুছে যায়। তবে কেউ যদি সিস্টেমকে তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দেন, তাহলে পরিচয় বিচ্ছিন্ন করে সেই তথ্য ৫ বছর পর্যন্ত প্রশিক্ষণের জন্য রাখা হতে পারে। নীতি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে চ্যাট ২ বছর এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত রেকর্ড ৭ বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে।

নতুন প্রযুক্তির নতুন ঝুঁকি

অ্যাপ থেকে কোনো চ্যাট ডিলিট করা মানেই কোম্পানির মূল সার্ভার থেকে সঙ্গে সঙ্গে তা মুছে যাওয়া নয়। দিন যত যাচ্ছে, সাইবার আক্রমণের ধরনও বদলাচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মডেল ইনভারশনের মতো নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যেখানে সাইবার অপরাধীরা নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে এআই মডেলের ভেতর থেকে ব্যবহারকারীর গোপন তথ্য বের করার চেষ্টা করে।

চ্যাটবটগুলোর হাতে যখন ইমেইল, শপিং ও গুগল ড্রাইভের অ্যাকসেস চলে আসছে, তখন এই ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

নিরাপদ থাকার উপায়

প্রথমত, সংবেদনশীল বা ব্যক্তিগত তথ্য এআইকে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। চ্যাটবটের সেটিংসে গিয়ে মডেল ট্রেনিং অপশন বন্ধ করে দেওয়া ভালো। সাময়িক চ্যাটের জন্য প্রাইভেট বা টেম্পোরারি মোড ব্যবহার করা যেতে পারে। চ্যাট শেষ হলে অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন ও আপলোড করা ফাইল ডিলিট করে দেওয়া উচিত।

এআই অ্যাসিস্ট্যান্টকে ইমেইল বা ড্রাইভে প্রবেশাধিকার দেওয়া আছে কি না, তাও যাচাই করা দরকার। সামাজিক মাধ্যমে নতুন কোনো ট্রেন্ড এলেই অন্যের ছবি তাদের অনুমতি ছাড়া এআইতে আপলোড করা ঠিক নয়। বিশেষ করে শিশুদের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা সংবেদনশীল নথি এআই চ্যাটবটে দেওয়া একেবারেই উচিত নয়।

ভাইরাল হওয়া আশির দশকের স্টাইলের ছবি হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দুই দিনে গায়েব হয়ে যাবে, কিন্তু সেটি বানানোর জন্য দেওয়া আসল ছবিটি এআই কোম্পানির সার্ভারে দীর্ঘদিন থেকে যাবে। তাই চ্যাটবট ব্যবহার বন্ধ করা নয়, বরং ব্যবহার করার সময় কী দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকাই আসল কথা।